বাংলাদেশের সড়কগুলোর সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যের একটি হলো যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া নির্গমন। এ ধোঁয়ার সঙ্গে বাতাসে মেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড, পার্টিকুলার ম্যাটারের (পিএম) মতো নানা ক্ষতিকর উপাদান। বিশ্বের সব দেশেই মোটরযান থেকে বায়ুদূষণ হয়। তবে দূষণের মাত্রা কমাতে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করে উন্নত দেশগুলো। সে মানদণ্ডে ঠিক করে দেয়া হয় যে একটি গাড়ি বাতাসে কী পরিমাণ দূষণ ছড়াতে পারবে। এক্ষেত্রে বহুল ব্যবহূত মানদণ্ড হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইমিশন স্ট্যান্ডার্ড। ১৯৯২ সালে প্রথম এ মানদণ্ড তৈরি করা হয়। এখন পর্যন্ত ছয়বার এটির উন্নয়ন বা আধুনিকায়ন করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ কাগজে-কলমে এ স্ট্যান্ডার্ডের কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় মানদণ্ড অনুসরণ করছে। যদিও বাস্তব চিত্র হলো এসব মানদণ্ডের কিছুই মেনে চলছে না বাংলাদেশে চলাচল করা সিংহভাগ মোটরযান।

ইউরোপিয়ান ইমিশন স্ট্যান্ডার্ডের প্রথম মানদণ্ড ইউরো-১ অনুযায়ী একটি পেট্রল বা ডিজেলচালিত গাড়িপ্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৭২ গ্রাম কার্বন নিঃসরণ করতে পারবে। নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসরণ করতে পারবে দশমিক ৯৭ গ্রাম। পরের তিন দশকে গাড়ি থেকে দূষণ নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে আরো পাঁচটি ইউরোপিয়ান ইমিশন স্ট্যান্ডার্ড। সর্বশেষ প্রণীত ইউরো-৬ অনুযায়ী, পেট্রলচালিত গাড়ি এক কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ১ গ্রাম কার্বন, দশমিক শূন্য ৬ গ্রাম নাইট্রিক অক্সাইড ও দশমিক শূন্য শূন্য ৫ গ্রাম পিএম নিঃসরণ করতে পারবে। আর ডিজেলে চলা গাড়ি কিলোমিটারপ্রতি দশমিক ৫ গ্রাম কার্বন, দশমিক শূন্য ৮ গ্রাম নাইট্রিক অক্সাইড ও দশমিক শূন্য শূন্য ৫ গ্রাম পিএম নিঃসরণ করতে পারবে। এমনকি এসব মানদণ্ড বিবেচনা করেই উন্নত দেশের উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো গাড়ি বাজারজাত করে।

বাংলাদেশের ভারী মোটরযানের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয় তিন দশক পুরনো মানদণ্ড ইউরো-১। আর হালকা গাড়ির ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয় ১৯৯৬ সালের মানদণ্ড ইউরো-২। ইউরো-২ অনুযায়ী, পেট্রলে চলা গাড়িগুলোর কিলোমিটারপ্রতি ২ দশমিক ২ গ্রাম কার্বন ও দশমিক ৫ গ্রাম নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসরণ করার কথা। একইভাবে ডিজেলে চলা গাড়ি কিলোমিটারপ্রতি ১ গ্রাম কার্বন, দশমিক ৭ গ্রাম নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসরণ করতে পারবে। কিন্তু আদতে দেশের গাড়িগুলো এসব মানদণ্ড মেনে চলছে কিনা তা পরীক্ষার কোনো উপায় নেই। অনেক সময় খালি চোখে কালো ধোঁয়া নিঃসরণের দৃশ্য দেখেই গাড়িগুলোকে জরিমানা করা হয় বা আইনের আওতায় আনা হয়।

এ বিষয়ে বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) সরওয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, গাড়ির কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের যান্ত্রিক সক্ষমতা নেই। তার পরও ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান পরিচালনার সময় অনেক ক্ষেত্রে খালি চোখেই বায়ুদূষণের বিষয়টি নিরূপণ করে দূষণের দায়ে জরিমানা করেন। কখনো কখনো গাড়ি ডাম্পিংয়েও পাঠানো হয়। এছাড়া পরিবহন থেকে দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গেও বিআরটিএ যৌথভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে।

অর্থাৎ কাগজে-কলমে বাংলাদেশে হালকা ও ভারী মোটরযানের ক্ষেত্রে দুটি পুরনো ইউরোপিয়ান ইমিশন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেশে চলাচল করা সিংহভাগ মোটরযানই আড়াই থেকে তিন দশকের পুরনো মানও অনুসরণ করে না। আবার বাংলাদেশে যে গাড়িগুলো আমদানি করা হয় সেগুলোর ক্ষেত্রেও যথাযথ মানদণ্ড পূরণ করা হয় না। বিদেশে মানদণ্ড অনুযায়ী গাড়ি উৎপাদন করা হলেও বাংলাদেশে আমদানির ক্ষেত্রে সেসব মাথায় রাখা হয় না। যার সম্মিলিত প্রভাব পড়ে পরিবেশে। ফলাফল হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরে পরিণত হয়েছে ঢাকা। দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অন্যান্য শহরাঞ্চলেও। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষার তথ্য বলছে, দেশের ৬৪ জেলার ৩ হাজার ১৬৩টি স্থানে গড় অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ১০২ দশমিক ৪১ মাইক্রোগ্রাম। যেখানে আদর্শ মান মাত্র ২৫ মাইক্রোগ্রাম। আর বাংলাদেশে বায়ুদূষণের প্রায় ১৪ শতাংশের জন্য দায়ী পরিবহন খাত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, বাংলাদেশে আমদানি করা গাড়িগুলোয় উৎপাদন পর্যায়েই দূষণ নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ডে ছাড় দেয়া হয়। এরপর চীন, ভারত থেকে নিম্নমানের ইঞ্জিন ও স্পেয়ার পার্টস সংযোজন করা হয়। ফলে বেশির ভাগ গাড়িই নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে। আবার সেটি নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থাও দেশে নেই।

পরিবহন মালিকদের হিসাবে রাজধানী ঢাকায় কম-বেশি পাঁচ হাজার পাবলিক বাস চলে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ‘বিজনেস মডেল ফর বাস অপারেশন ইন ঢাকা সিটি আন্ডার প্রপোজড বিআরটি সিস্টেম সিনারিও’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার রাস্তায় এমন বাস নামানো হয়, যেগুলোর বিনিয়োগ খরচ এরই মধ্যে উঠে এসেছে। পুরনো হয়ে যাওয়ায় এসব বাসের রক্ষণাবেক্ষণও মালিকরা ঠিকমতো করেন না। পুরনো হয়ে যাওয়া আর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঢাকার পাবলিক বাসগুলো দূষণ ছড়াচ্ছে নির্ধারিত মানের কয়েক গুণ বেশি। শুধু রাজধানী ঢাকায়ই নয়, ঢাকার বাইরেও যেসব পাবলিক বাস চলাচল করছে, তার একটা বড় অংশ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের কোনো মানদণ্ডই মানছে না। অর্থাৎ কেবল ঢাকার রাস্তায়ই মানহীন কয়েক হাজার বাস চলাচল করছে।

বিআরটিএর হিসাবে রাজধানীতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কার আছে ৩ লাখ ১৪ হাজার। এসব গাড়ির প্রায় ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে এসেছে রিকন্ডিশন্ড হিসেবে। তাই নতুন গাড়ির চেয়ে পুরনো গাড়িগুলো দূষণ ছড়াচ্ছে নির্ধারিত মানের চেয়ে অনেক বেশি। এসবের বাইরে মাইক্রোবাস, ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান, ট্যাংক, হিউম্যান হলার, মোটরসাইকেল, লরিসহ বিভিন্ন ধরনের হালকা ও ভারী মোটরযান থেকেও ক্ষতিকর উপাদন নির্গত হচ্ছে সমানতালে।

শুধু নির্ধারিত মানদণ্ডের ব্যত্যয়ের কারণেই নয়, বাংলাদেশে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত নিম্নমানের ডিজেলও দূষণের পাল্লা ভারী করছে বলে উঠে এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে। বিশেষ করে সালফারযুক্ত ডিজেলের কারণে গাড়ি থেকে বায়ুদূষণ বেশি হচ্ছে বলে এডিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই ধরনের কথা বলেছেন বাংলাদেশ অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) প্রেসিডেন্ট ও নিটল মোটরস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মাতলুব আহমাদ। তিনি বলেন, পরিবহন খাত থেকে পরিবেশ দূষণ কমাতে আমাদের এ মুহূর্তে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। প্রথমটি হলো সালফারযুক্ত ডিজেলের ব্যবহার বন্ধ করা।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো বিদ্যুচ্চালিত মোটরযান প্রবর্তন ও এর ব্যবহার বাড়ানো। বাংলাদেশে নিটল মোটরস ইলেকট্রিক মোটরগাড়ি প্রবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।