বয়স ১২ পেরোয়নি। আরো দুই বছর আগে থেকেই কাজের বোঝা কাঁধে তুলে নিয়েছে মো. শুভ। রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের রিমেল গার্মেন্টসে কাপড় কাটার কাজ করে সে। একই গার্মেন্টসে কাজ করে মো. সুমন। বয়সে শুভর চেয়ে এক বছরের ছোট।
পড়াশোনা ফেলে কাজে আসার কারণ জানতে চাইলে জবাবে তারা দুজন এক ফালি হাসি উপহার দিলেও কোনো যৌক্তিক কারণ বলতে পারেনি। শুভ ও সুমনের মতো অন্তত ১২-১৫ হাজার শিশু কেরানীগঞ্জে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমের সঙ্গে জড়িত। মালিকপক্ষের অসাধুতা এবং প্রশাসনের নজরদারির অভাবে ক্রমেই শিশুশ্রমিক বাড়ছে কেরানীগঞ্জে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা হয়েছে, কেরানীগঞ্জকে শিগগিরই দেশের প্রথম শিশুশ্রমমুক্ত মডেল এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মধ্যে সারা দেশ শিশুশ্রমমুক্ত করা হবে।
বৈশ্বিকভাবে শিশুশ্রম বন্ধের ঘোষণা দিলেও কেরানীগঞ্জসহ আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় এটি বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে, ‘শিশু’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি এবং ‘কিশোর’ অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেছে কিন্তু ১৮ পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ অনুসারে, শিশুদের আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে দেয়া যাবে না। কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেয়া যাবে না। ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসকের কাছ থেকে শিশু-কিশোরদের সক্ষমতা সনদ নিয়ে শর্তসাপেক্ষে হালকা কাজে নিয়োগ দেয়া যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ হলো দারিদ্র্য। আর আমাদের দেশের বড় একটা অংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এসব পরিবারের সদস্যদের মাথাপিছু আয় দৈনিক ১০০ টাকারও কম। কেরানীগঞ্জের মতো এলাকার বেশির ভাগ পরিবার অসচ্ছল। ফলে এসব পরিবারের শিশুরা অর্থ রোজগারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে। পরিবারের প্রয়োজন থাকায় শিশুরা লেখাপড়ার পরিবর্তে এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরু করতে বাধা পাচ্ছে না।
শুভাঢ্যা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি কারখানা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, এ এলাকায় ৯-১৪ বছরের শিশুশ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। তারা হালকা থেকে শুরু করে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে মোটর ওয়ার্কশপ, ওয়েল্ডিং মেশিন, গ্যাস কারখানা, লেদ মেশিনের কাজ; রিকশা চালানো, বাস-ট্রাকের হেলপারি, নির্মাণকাজ, গৃহকর্মী, ইটভাঙা, ইটভাটা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, স্টিলের আলমারির দোকান ইত্যাদিতে কাজ করা। তবে কেরানীগঞ্জে প্রচুর গার্মেন্টস ও ওয়াশিং কারখানা থাকার ফলে এসব কারখানায় শিশুশ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
আলভি এন্টারপ্রাইজে সিফাত (১৪) কাপড় লন্ড্রির কাজ করে। কথা বলে জানা গেছে, ভোলা থেকে এসেছে সে। মূলত পরিবারের আর্থিক দৈন্যের কারণে কাজে যোগ দিতে হয়েছে তাকে। তার ভাষায়, ‘বাবা নেই। মা পরের বাড়িতে কাজ করে। ছোট ভাই স্কুলে যায়। টাকার অভাবে আমি পড়তে পারি না। এখানে কাজ করে যে টাকা পাই বেশির ভাগই বাড়ি পাঠিয়ে দিই।’
কেরানীগঞ্জে কর্মরত শিশুরা নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত। ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজে কর্মরত মো. সাগর (১৪) বণিক বার্তাকে বলে, ‘মাসে ৬ হাজার টাকা বেতনে কাপড় কাটার কাজ করি। কিছুদিন আগে পাশের দোকানের কাঁচিতে হাত কেটে গেছে আমার বয়সী এক শ্রমিকের। আমরা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করি। তাছাড়া এ বয়সে খেলাধুলা ও পড়াশোনার সুযোগ থাকা দরকার। সেসব তো পাচ্ছিই না, উল্টো ভালো খাওয়াও জোটে না। আমি যে দোকানে কাজ করছি এটা একটা মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। যেকোনো মুহূর্তেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবু পেটের দায়ে কাজ করছি। কেউ তো আমাদের নিয়ে ভাবে না।’
শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার পেছনে প্রশাসনের নজরদারিকে দুষছেন মালিকপক্ষ। অন্তত পাঁচজন মালিকের সঙ্গে কথা বললে তারা একই দাবি করেন। তাদের ভাষ্যমতে, প্রশাসনের লোকজন তদারকিতে আসে না। এলেও টাকা-পয়সা দিলে ম্যানেজ হয়ে যায়। তাছাড়া শিশুদের বাবা-মায়েরা স্বেচ্ছায় শিশুদের কাজে পাঠায়। শিশুদের কম টাকায় কাজে লাগানো যায়, এটাও শিশুশ্রমের একটা বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছেন কারখানার মালিকরা।
শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছে বেসরকারির সংস্থা এডুকো বাংলাদেশ। সংস্থাটির শিশুশ্রম নিরসন বিভাগের ব্যবস্থাপক আফজাল কবীর খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুশ্রমে আমরা এখনো গোড়ায় কাজ করছি না। শিশুশ্রম নিয়ে আমরা দৃশ্যমান যা দেখছি তা নিয়েই কাজ করছি। একই সঙ্গে আমাদের পেছনের কারণ সম্পর্কেও ভাবতে হবে। কেন শিশুরা শ্রমে জড়াতে বাধ্য হচ্ছে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।’
শিশুশ্রম নিরসনে আইনের প্রয়োগ এখনো বেশ দুর্বল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইন যা আছে মোটামুটি যথেষ্ট। এখন এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে, যারা শিশুদের কাজে নিচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনলে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ত। মানুষ বুঝত শিশুদের কাজে নেয়া একটা অপরাধ।’
শিশুশ্রম নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘শিশুশ্রম নিরসনে একক উদ্যোগ কখনই ভালো ফল বয়ে আনবে না। এজন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অনেকে বলেন, শিশুরা কাজ করছে এতে ক্ষতি কী? কিন্তু শিশুটি যে সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে না, আনন্দমুখর শৈশব পাচ্ছে না—এতে কিন্তু তার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুর অভিভাবকদেরও বোঝাতে হবে শিশুকে যেন কাজে না পাঠানো হয়। এজন্য প্রয়োজনে প্রণোদনা বা অন্য কোনো সহযোগিতা সরকারের পক্ষ থেকে করতে হবে।’
কেরানীগঞ্জে শিশুশ্রম নিরসনে প্রশাসনের নজরদারি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ঢাকা) একেএম সালাউদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেরানীগঞ্জকে শিশুশ্রমমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ লক্ষ্যে আমাদের পরিদর্শনের পরিমাণ বাড়িয়েছি। এ পর্যন্ত আমরা ২৫টি মামলা দিয়েছি। নজরদারি নেই—এ কথাটি সঠিক নয়। আমাদের পরিদর্শনের কারণেই কেরানীগঞ্জে শিশুশ্রমের সংখ্যা কমে আসছে।’










