বরিশাল অঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালটি এখন যান্ত্রিক ত্রুটিতে ধুঁকছে। এখানকার রোগ নির্ণয়ের শতকোটি টাকার সব যন্ত্র বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। সিটি স্ক্যান, এমআরআই, কোবাল্ট-৬০ মেশিন, সেল সিরাম সেপারেটর, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ও ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনগুলো বিকল হয়ে আছে দীর্ঘদিন। এতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
হাসপাতালের কোটি কোটি টাকায় ক্রয় করা মেশিনগুলো দীর্ঘদিন বিকল থাকায় রোগীরা উপকারভোগী হতে পারছে না। তারা বাধ্য হয়ে হাসপাতালের সামনে থাকা ব্যক্তিমালিকানার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকায় বিভিন্ন পরীক্ষা করছেন। দেশের অন্যসব হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগ খোলা থাকে।
হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মস্তিষ্ক, হাড় বা শরীরের জটিল রোগ নির্ণয়ের জন্য ২০০৮ সালে কেনা হয় একটি এমআরআই ও দুটি সিটি স্ক্যান মেশিন। ২০১৫ সালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখিয়ে বন্ধ ঘোষণা করা হয় একটি সিটি স্ক্যান মেশিন। অন্যটি ২০১৮ সালে হাসপাতালের উন্নয়ন কাজ চলার সময় পানি ঢুকে বিকল হয়। ২০১৯ সালে পুরোপুরি বিকল ঘোষণা করা হয় এমআরআই মেশিনটি। এর পর থেকে মেশিনটি তিনটি মেরামত বা নতুন করে ক্রয়ের কোনো উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের।
এ বিভাগের জন্য বিভিন্ন সময়ে মোট ১৫টি এক্স-রে মেশিন কেনা হয়। তার মধ্যে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনও রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে মাত্র দুটি এক্স-রে মেশিন ও করোনা হাসপাতালের জন্য ক্রয় করা একটি চালু রয়েছে। বাকি ১২টি এখন অচল হয়ে আছে।
হাসপাতালে আটটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন রয়েছে। যার মধ্যে চালু আছে মাত্র তিনটি। তবে একটি যান্ত্রিক ত্রুটি থাকায় মেরামতে পাঠানো হয়েছে। মাত্র দুটি মেশিন দিয়েই চলছে সেবা কার্যক্রম। বাকি পাঁচটি এখন বিকল। ফলে জোড়াতালি দিয়েই চলছে এ রোগ নির্ণয় শাখা।
ক্যান্সারের রোগীদের রেডিয়েশন দেয়ার জন্য বরিশাল বিভাগে একমাত্র কোবাল্ট-৬০ রয়েছে শেবাচিম হাসপাতালে অথচ গত ৪ বছর মেশিনটি বিকল অবস্থায় রয়েছে। এ কারণে হাসপাতালে আসা জটিল রোগীদের এখন অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বাইরে থেকেই করিয়ে আনতে হচ্ছে সব পরীক্ষা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনরা জানান, সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকায় ক্রয় করা যন্ত্রগুলো অচল থাকায় তাদের দুর্ভোগের সীমা নেই। এর মধ্যে এখানকার টেকনোলজিস্টদের খারাপ ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে বাইরে থেকেই সবাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে আনছেন।
রোগীর স্বজন রেজাউল করিম বলেন, চিকিৎসা যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটছেন চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডসংশ্লিষ্টরা। তারা বাইরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অংশীদার থাকায় রোগীদের সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য করছেন।
শেবাচিম সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের ইনডোরে চিকিৎসা দেয়া ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৯টি। এখান থেকে সব রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে পাঠানো হচ্ছে স্লিপ দিয়ে। একই অবস্থা ভর্তি থাকা রোগীর ক্ষেত্রেও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে, লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক কর্মচারী জানান, লাইফ এইড সিটি স্ক্যান সেন্টার প্রতিটি সিটি স্ক্যান বাবদ ৬০০- ৮০০ টাকা
মেডিসিন ওয়ার্ডের ডাক্তারদের কমিশন দেন। যে কারণে মেডিসিন ১, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ডাক্তাররা সরাসরি লাইফ এইড ও বরিশাল সিটি সেন্টারের নাম লিখে দেন। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে ওই তিনটি ওয়ার্ডের ডাক্তাররা ৭০-৮০ হাজার টাকা কমিশন পেয়ে থাকেন।
যন্ত্রাংশ বিকল থাকার বিষয়ে হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বাবুল আক্তার বলেন, কোনো মেশিন বিকল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়। তারা ব্যবস্থা না নিলে আমাদের করার কিছুই থাকে না। যেগুলো সচল আছে তা দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হয়।
এ ব্যাপারে হাসপাতাল পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুর ইসলাম বলেন, যে মেশিনগুলো ইঞ্জিনিয়াররা বাতিল বলেছেন, সেগুলো নতুন করে ক্রয়ের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আর যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বন্ধ থাকা মেশিনগুলো মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করি শিগগিরই এগুলো মেরামতের ব্যবস্থা করা হবে।










