আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বছর কয়েক আগে বগুড়ার পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইন বিভাগে ভর্তি হন মোছা. সাদিয়া আকতার। স্বাভাবিক নিয়মেই চার বছরের ব্যাচেলর অব ল’জ (এলএলবি) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন এ ছাত্রী। যদিও কোর্স শেষ হওয়ার পর বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত এ ছাত্রীর হাতে সনদ তুলে দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কারণ আইন বিভাগ পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদনই পায়নি পুন্ড্র কর্তৃপক্ষ।

শুধু সাদিয়া নন, পুন্ড্র কর্তৃপক্ষের এমন অনিয়মের খেসারত দিতে হচ্ছে শতাধিক শিক্ষার্থীকে। সনদ না পাওয়ায় কর্মজীবন নিয়ে ঝুঁকিতে পড়েছেন এসব ছাত্র-ছাত্রী। বিভাগের চেয়ারম্যান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, রেজিস্ট্রার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজসহ প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সনদ বিষয়ে কোনো সদুত্তর মিলছে না তাদের। কোথাও সমাধান না পেয়ে কয়েক মাস আগে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বগুড়ার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ স্মারকলিপি দেয়া হয়।

সেখানে শিক্ষার্থীরা লিখেছেন, ‘আমরা ১৫০ জন শিক্ষার্থী, পুন্ড্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতারণার শিকার হয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবন এখন চরম হুমকির মুখে। আমাদের শিক্ষাজীবনের মূল্যবান চারটি বছর, শ্রম, অর্থ—সবকিছুই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রতারিত হয়ে বৃথা হয়ে যাওয়ার পথে। আমাদের সব স্বপ্ন, আমাদের অভিভাবকদের স্বপ্ন আজ নিঃশেষ হওয়ার পথে। আপনি দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, আমাদের অভিভাবক। এ চরম বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে আমাদের উদ্ধার করুন। আমাদের সনদের ব্যবস্থা করুন।’

শিক্ষার্থীদের আবেদন আমলে নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের এপ্রিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয় রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের জন বিভাগ। ওই নির্দেশনার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইউজিসিকে চিঠি দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইউজিসির অনুমোদনকে অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে। যদিও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। এটা অনেক বড় অনিয়ম। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করার অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। এ অনিয়মের বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও আরো বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ইউজিসির ওয়েবসাইটের পাশাপাশি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা তুলে ধরা হয়। তবে এটাও ঠিক, একটি জেলা শহরের শিক্ষার্থীদের অনুমোদন প্রক্রিয়া বিষয়ে না জানাটাই স্বাভাবিক। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ঠকানো উচিত নয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে ইউজিসির অনুমোদন নেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন বিভাগ খোলার জন্য তদারক সংস্থা ইউজিসিতে লিখিত আবেদন জমা দিতে হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। আবেদনের পর এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে দেয় ইউজিসি। ওই কমিটি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো পরিদর্শন ও শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিতসহ সার্বিক সক্ষমতা যাচাই করে। কমিটির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সুপারিশ করার পর নতুন বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় ইউজিসি। বিভাগের সিলেবাসের অনুমোদনও ইউজিসি থেকে নিতে হয়। ইউজিসির চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কোনো প্রোগ্রাম বা বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তির বিজ্ঞপ্তি বা বিজ্ঞাপন প্রকাশও বিধিসম্মত নয়। আর আইন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে ইউজিসির পাশাপাশি বার কাউন্সিল থেকেও ছাড়পত্র নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে উচ্চ আদালতের। যদিও এ দুটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়াই ২০১৬ সাল থেকে বেআইনিভাবে আইন বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে পুন্ড্র বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ভর্তি হওয়ার সময় তাদের জানানো হয়েছিল প্রোগ্রামটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত। ক্লাস শুরুর বছর দুয়েক পর তারা জানতে পারেন যে প্রোগ্রামটির ইউজিসি ও বার কাউন্সিলের অনুমোদন নেই। এ বিষয়ে জানতে কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হলে অনুমোদন সংক্রান্ত সমস্যার অচিরেই সমাধান হওয়ার আশ্বাস দেয়া হয়। ওই সময় ভিসি ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা ক্লাস চালিয়ে যান। এমন আশ্বাসের মধ্যেই কয়েকটি ব্যাচ এলএলবি ও এলএলএম শেষ। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও সনদ পাচ্ছেন না তারা। উল্টো শতাধিক শিক্ষার্থীর সনদ না দিয়ে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইন বিভাগের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের মাঝপথে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

এদিকে রাষ্ট্রপতির কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সনদ সংক্রান্ত গুরুতর একটি অভিযোগও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তাদেরকে জানান, চাইলে শিক্ষার্থীরা অন্য বিভাগের সনদ নিতে পারেন। পরবর্তী সময়ে ভিসিসহ দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার একই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও বেআইনি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএনএম রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, আইন বিভাগ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, এর শুরু হয়েছে আমি দায়িত্ব নেয়ার অনেক আগে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানাভাবে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমার পক্ষে এর বেশি বলার সুযোগ নেই। রেজিস্ট্রার এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।

এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সনদ দেয়ার প্রস্তাব বিষয়ে জানতে চাইলে পুন্ড্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক আনসার আলী তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, এসব বিষয়ে রেজিস্ট্রার স্যার ভালো বলতে পারবেন। বর্তমানে ইউজিসি ও বার কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। আশা করছি, দ্রুতই এর সমাধান দিতে পারব।

তবে এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রারের সঙ্গে বারবার টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।