চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে আবারো মরে ভেসে উঠছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। গতকাল দুপুর থেকে জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে দশানি পর্যন্ত মেঘনা পাড়ের বিভিন্ন স্থানে মাছ মরে ভেসে থাকতে দেখা গেছে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে নদীর এখলাশপুর থেকে ছটাকি পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ইলিশের পোনা, পোয়া, বেলে, চেউয়া, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক মরে ভেসে ওঠে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, জানুয়ারিতে মাছ মরে ভেসে ওঠার বিষয়টি তদন্ত হয়েছে। নতুন করে মাছ মরে যাওয়ার ঘটনা তদন্ত করা হবে।
এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর চাঁদপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেঘনা নদীতে মাছ মরে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। প্রতিবেদনে নদীর পানিতে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, পিএইচ ও অক্সিজেনের হার কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া নদীর তলদেশ দিয়ে কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও কেমিক্যালযুক্ত পানি বয়ে যাচ্ছে। নতুন করে আবার কেন মাছ মারা যাচ্ছে, সেটি তদন্ত করে দেখতে হবে।’
পরিবেশবিদরা বলছেন, দেশের অন্যতম প্রধান নদী মেঘনা। পূর্ব ভারতের পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে সিলেট অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে নদীটি। প্রবাহিত হয়েছে কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও ভোলার মধ্য দিয়ে। তবে শিল্প-কারখানার বর্জ্যের দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের এ নদীর জীববৈচিত্র্য। মারা যাচ্ছে মাছ ও জলজ প্রাণী।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘মতলবের মাটি ও মানুষ’-এর সভাপতি শামীম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীকে কেন্দ্র করে হাজারো পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। বারবার দূষণে নদী এখন মৃতপ্রায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আন্তঃজেলা পরিবেশ কমিশন গঠন এবং কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এ ঘটনায় শুধু পরিবেশ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শত শত মৎস্যজীবী। নদীর ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবিকা এখন হুমকির মুখে।’
স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানান, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কলকারখানার কেমিক্যালযুক্ত পানি মেঘনা নদীর তলদেশ দিয়ে আসছে। নদীর পরিবেশ দূষিত হয়ে মারা যাচ্ছে মাছ ও জলজ প্রাণী। ইলিশের পোনা, পোয়া, বেলে, চেউয়া, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকও মরে যাচ্ছে। ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে নদীর পানি।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, গতকাল ভোরে মাছ ধরতে নদীতে নামেন জেলেরা। তখনই তারা দেখতে পান পানিতে ভেসে রয়েছে অসংখ্য মরা মাছ। বিশেষ করে জাটকা, চেউয়া, বেলে, টেংরা, পুঁটি, চাপিলাসহ দেশীয় প্রজাতির মাছ মারা যাচ্ছে। পচা মাছের দুর্গন্ধে নদীপাড়ের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। দূষণের কারণে এখন নদীর পানি পান ও ব্যবহার করতে পারছে না স্থানীয়রা। কী কারণে বারবার নদীতে মাছ মারা যাচ্ছে এবং পানি দূষণ হচ্ছে তার সমাধান চায় তারা।
ইলিশের পোনা ও জাটকা মরে ভেসে ওঠায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন মেঘনাপাড়ের জেলেরা। এভাবে ছোট আকারের জাটকা মারা গেলে চলতি মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাবেন কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে জেলেদের মধ্যে।
ষাটনল এলাকার জেলে পলাশ বর্মন বলেন, ‘এ নদীই আমাদের জীবন। কিন্তু এখন মাছ তো নেই, বরং দূষণ ছড়িয়ে গেছে পানিতে। কয়েক বছর ধরেই এমন হচ্ছে। কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। জাটকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে মাছশূন্য হয়ে পড়বে মেঘনা।’
দশানি এলাকার বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, ‘শিশুরা নদীতে খেলতে যায়, গোসল করে। এখন তো মনে হচ্ছে পানিতে হাত দিলেও অসুস্থ হয়ে যাবে। আমরা নদীর পানি সবসময় ব্যবহার করেছি। কিন্তু এখন ব্যবহার করতে পারছি না।’
মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, যে অবস্থা দেখছি, তাতে আগামী কয়েক মাস নদী থেকে মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বাজারে মাছের দাম বেড়ে যাবে। যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর।
পার্শ্ববর্তী কলাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. শামসুদ্দিন বলেন, ‘যেসব এলাকায় মাছ মরে যাচ্ছে, ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। নদীর এ অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাছ মরার ঘটনা শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়, মানুষের জীবিকার ওপরও সরাসরি আঘাত। শত শত মানুষ নদীর ওপর নির্ভরশীল। পানিদূষণের বিষয়ে বারবার অভিযোগ করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। নদী বাঁচলে আমরা বাঁচব, এটাই এখন সবার মূল দাবি হওয়া উচিত।’
সার্বিক বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি নিছক মাছ মরার ঘটনা নয়, এটি একটি জলজ পরিবেশগত দুর্যোগ। শীতলক্ষ্যা থেকে আসা দূষিত পানির প্রবাহ একাধিকবার এ এলাকায় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এটি প্রথম নয়, একাধিকবার ঘটেছে এমন ঘটনা। ২০২৩ সালের মার্চ ও ২০২৪ সালের আগস্টেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। তখনো মেঘনার পানি দূষিত হয়ে মাছের গণমৃত্যু হয়। তবে এবার মাছ মরার পরিমাণ আরো বেশি দেখা যাচ্ছে।’










