দেশে আবাসন ও গৃহস্থালি খাতে ব্যবহার বাড়ছে সিরামিক পণ্যের। সম্প্রসারণ ঘটছে সিরামিক শিল্পেরও। ক্রমপ্রসারমাণ এ শিল্প খাতের বাজার, বিনিয়োগ ও ব্যবসা নিয়ে ধারাবাহিক পর্ব-৩
বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭২-৭৬) প্রণয়ন হয় ১৯৭২ সালে। সেখানে দিকনির্দেশনা ছিল দেশজ কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে সিরামিক পণ্য উৎপাদন এবং চাহিদা পূরণের। বিদেশী মুদ্রা সাশ্রয়ই ছিল সে পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য, যা বাস্তবায়নে ১৯৭৫ সালে স্থাপিত হয় বাংলাদেশ ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিআইএসএফ)। পরে ১৯৮১ সালে স্থাপন হয় চার হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন স্যানিটারিওয়্যার প্লান্ট।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সিরামিক স্যানিটারিওয়্যার (কমোড, প্যান, বাথটাব, বেসিন ইত্যাদি) উৎপাদনের পথ তৈরি হয় আশির দশকের শুরুতে সরকারি উদ্যোগে। আর আশির দশকেই পথচলার ভিত আরো শক্তিশালী হয় ব্যক্তি খাতের হাত ধরে। আধুনিক সিরামিক কারখানা স্থাপন করে শুরু হয় পণ্য উৎপাদন। শুরুতে টেবিলওয়্যার উৎপাদনের ঝোঁক বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার উৎপাদন সক্ষমতাও গড়ে ওঠে।
সিরামিক পণ্যের ব্যক্তি খাতের শিল্পোদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত সিরামিক শিল্পে শুধু স্যানিটারিওয়্যার পণ্যের বাজারের আকার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা এখন আরো বেড়েছে। দেশের সিরামিক পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান আছে মোট ৬৮টি, যার মধ্যে ১৮টি স্যানিটারিওয়্যার উৎপাদন করে।
দেশে সিরামিক স্যানিটারিওয়্যার উৎপাদনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে আরএকে, আবুল খায়ের, আকিজ, চারু, এক্সিলেন্ট, স্টার, স্যানিটা, ইউরো বাংলা, বিআইএসএফ, অ্যাপল, গ্লোরি, সোলার ও ঢাকা সিরামিক অ্যান্ড স্যানিটারি। এর মধ্যে বার্ষিক টার্নওভার বিবেচনায় আরএকে, আবুল খায়ের, আকিজ, চারু ও এক্সিলেন্ট—পাঁচ প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে ৭০ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাজার। আর ৫৪ শতাংশের দখলে রয়েছে আরএকে, আবুল খায়ের ও আকিজ।
দেশে সিরামিক শিল্প-কারখানাগুলোয় মূলত তিন ধরনের পণ্য উৎপাদন হয় টাইলস, টেবিলওয়্যার ও স্যানিটারিওয়্যার। শুধু স্যানিটারিওয়্যার তৈরিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১ হাজার ৫৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সিরামিক শিল্পে মোট বিনিয়োগের ১৭ শতাংশ হয়েছে স্যানিটারিওয়্যার উৎপাদনে। পণ্যটির বছরে উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার পিস। পণ্য উৎপাদনে সরাসরি নিয়োজিত কর্মী রয়েছেন ৭ হাজার ৮০২ জন। বছরে বিক্রীত সিরামিক পণ্যের ১৭ শতাংশ সিরামিক স্যানিটারিওয়্যার। পণ্যটি রফতানিও হয়, কিন্তু তা মোট সিরামিক পণ্য রফতানির মাত্র ১ শতাংশ।
স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি চাহিদা মেটাতে আমদানিও করতে হয় সিরামিক স্যানিটারিওয়্যার। পণ্যটির মোট ব্যবহারের ৩৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ আমদানি হয়, বাকি ৬৫ দশমিক ৯২ শতাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি। আমদানির বার্ষিক অর্থমূল্য ৪৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। দেশের বাজারে স্যানিটারিওয়্যার বিক্রির পরিমাণ বছরে ৮৬০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আমদানি ও স্থানীয় বিক্রি মিলিয়ে বছরে ১ হাজার ৩০৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার স্যানিটারিওয়্যার ব্যবহার হয় বাংলাদেশে। এছাড়া অর্থমূল্য পরিমাণ খুব কম হলেও স্যানিটারিওয়্যার রফতানি হয় বাংলাদেশ থেকে, যার অর্থমূল্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
বিসিএমইএ প্রতিনিধিরা বলছেন, দেশের সিরামিক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা থাকা পণ্যটি হলো স্যানিটারিওয়্যার। টাইলস ও এ পণ্যের চাহিদা বাড়ছে সমান্তরালভাবে। অর্থাৎ আবাসন খাতে বাসাবাড়িতে টাইলসের পাশাপাশি স্যানিটারিওয়্যারের অপরিহার্যতা দেখা দিচ্ছে। তাই আবাসন খাতের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে স্যানিটারিওয়্যারের চাহিদাও বাড়ছে। গ্যাসের মতো অপরিহার্য সেবার পাশাপাশি সিরামিক শিল্পে অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো দক্ষ নকশাকার বা ডিজাইনার।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সিরামিক পণ্যের মধ্যে নকশাকারের প্রয়োজন পড়ে মূলত টেবিলওয়্যার ও স্যানিটারিওয়্যারে। টাইলসেও নকশার প্রয়োজন হয়, তবে তা টেবিলওয়্যার ও স্যানিটারিওয়্যারের মতো বেশি না। নিজস্ব নকশা ও নকশাকার দুয়েরই ঘাটতি আছে বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে শ্রীলংকা, ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডের কর্মী আছেন, যারা কাজ করছেন বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের কারখানাগুলোতে। আবার টেবিলওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার ও টাইলসের তিন খাতের নকশাকারের চাহিদাও ভিন্ন। দেশে বাজারজাতে নকশাকারের চাহিদা অতটা গুরুত্বপূর্ণ না। কারণ দেশের মানুষের নান্দনিক সচেতনতার মাত্রা খুব বেশি না। আবার রফতানি বাজার প্রসারে বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা নিজস্ব নকশা ও নকশাকারের ঘাটতি।
জানতে চাইলে বিসিএমইএর জেনারেল সেক্রেটারি ইরফান উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের সিরামিক পণ্যে বিশেষ করে টাইলস ও স্যানিটারি পণ্য মূলত স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক। দেশের চাহিদা মিটিয়ে তার পরই রফতানি করছেন দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। সেক্ষেত্রে অন্যতম বড় দুর্বলতার ক্ষেত্র হলো নিজস্ব নকশা ও নকশাকার। এ দুই বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। ফলে রফতানি বাজার সম্প্রসারণের গতি ততটা বেশি নয়। স্থানীয় বাজারে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে শিল্পগুলো সাধারণত বিদেশী নকশা অনুসরণ করে পণ্য উৎপাদন করছে। আর যারা রফতানি করছেন, তারা ক্রেতার দেয়া নকশা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করছেন। তবে রফতানি বাজার সম্প্রসারণের অনেক সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। সে লক্ষ্যে কাজও করছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
সিরামিক স্যানিটারিওয়্যার পণ্য রফতানি হলেও তা ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানই করেছে। বর্তমানে আরো দু-একটি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা রফতানির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এককভাবে রফতানি করেছে শুধু আকিজ সিরামিকস। ওই অর্থবছর স্যানিটারিওয়্যার রফতানির ৯৫ দশমিক ৪৭ শতাংশই হয়েছে যুক্তরাজ্যে। এছাড়া রফতানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে আছে সেশেলস, ডেনমার্ক, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও থাইল্যান্ড।
২০১৯-২০ অর্থবছর দেশ থেকে স্যানিটারিওয়্যার রফতানি করা একক প্রতিষ্ঠান ছিল আকিজ সিরামিকস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, স্যানিটারিওয়্যারে আকিজ বাংলাদেশের একমাত্র কোম্পানি, যারা যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি করছে। আমরা বড় ধরনের বিনিয়োগে আসছি স্যানিটারিওয়্যারে। সব ধরনের সিরামিক পণ্যেই আমরা সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। আগামী বছরের মধ্যে বর্তমান সক্ষমতা দ্বিগুণ করার প্রত্যাশা করছি। স্যানিটারিওয়্যার রফতানির ক্ষেত্রে বড় একটা দুর্বলতার জায়গা হলো নকশা ও নকশাকার। এমনকি প্রয়োজনীয় মোল্ডও দেশের বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। এসব ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে স্যানিটারিওয়্যার পণ্য ব্যবহারের অর্থমূল্য ছিল ৬০৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। চার বছরের ব্যবধানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসে তা বেড়েছে ১১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই সিরামিক স্যানিটারিওয়্যারের ব্যবহার ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর ব্যবহারের অর্থমূল্য ছিল ১ হাজার ১৭৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
দেশে স্যানিটারিওয়্যারের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে সিরামিক পণ্য বিশেষ করে টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যারের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এখন অনেক নির্মাণকাজ হচ্ছে, এক্ষেত্রে টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যারের চাহিদা সমান্তরালভাবে বাড়ছে। স্যানিটারিওয়্যারের অনেক কাজ ম্যানুয়ালি করতে হয়। সহজেই এ পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণে যাওয়া যায় না। ফলে স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিও করতে হয়। স্থানীয় উৎপাদকদের নকশা ও নকশাকারজনিত সমস্যা থাকলেও বহুজাতিক হিসেবে আমাদের কোম্পানির ওই সমস্যা নেই। আশা করছি স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারাও এ সমস্যা কাটিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন।










