সাতক্ষীরার সুন্দরবন পশ্চিম জোন বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জের দর্শনীয় স্থান কলাগাছিয়া, দোবেকি ও জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন আকাশলীনায় দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে অনেক দর্শনাথী আসছেন সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এছাড়া কিছু বিদেশী পর্যাটকও সুন্দরবন ভ্রমণে আসছেন বলে জানান বনসংশ্লিষ্টরা। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি সুযোগ-সুবিধা বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। পর্যটকদের দাবি, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রিসোর্ট বা হোটেল-মোটেল নির্মাণ হলে পর্যটক আরো বাড়বে।

ঢাকার গুলশান থেকে আগত অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী মুর্শিদ হোসেন ফাহিম, সেজুতি পারভীন ও অভি আহমেদ জানান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অনেক দর্শনীয় স্থানে গিয়েছি। বাংলাদেশের সুন্দরবনের মতো এত মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি অন্য কোথাও পাইনি। হাজার রকমের উদ্ভিদ, বন্য ও জলজপ্রাণীতে ভরপুর বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, যা কাছ থেকে দেখে মুগ্ধ হয়েছি আমরা। সময় পেলে আবারো আসবেন বলে জানান প্রবাসী দর্শনার্থীরা। যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নতির পাশাপাশি সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলারও দাবি জানান তারা।

দেশের উত্তরবঙ্গের জেলা জয়পুরহাট থেকে আগত কলেজছাত্র ইমন হোসেন, ফয়সাল আহমেদ ও তানভীর মাহমুদ জানান, প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ভ্রমণে এসে প্রকৃতি উপভোগ করেছেন। এর আগে রাঙ্গামাটি ও রংপুর বিভাগের অনেক দর্শনীয় স্থান ঘুরেছেন। কিন্তু সুন্দরবনের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তা অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি। সময় পেলে আবারো সুন্দরবন ভ্রমণে আসবেন বলে জানান তারা।

সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্ট টাইগার পয়েন্ট ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের উপপরিচালক মোস্তফা আকতারুজ্জামান বলেন, বাস বা অন্য যেকোনো যানবাহন থেকে নেমেই সরাসরি সুন্দবরন দেখা যায় কেবল সাতক্ষীরায়। অন্য এলাকা দিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণে গেলে নৌপথে অনেক দূর অতিক্রম করার পর সুন্দরবনের দেখা মেলে। পর্যটক বাড়াতে হলে এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত করার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। তাছাড়া সরকারিভাবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। একজন পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণে এলে প্রথমেই তিনি সুপেয় পানি সংকটে পড়েন।

এদিকে সাতক্ষীরা বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। গেল বছর ভ্রমণকারীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৬৭৯ জন, যা প্রতি মাসে গড়ে সোয়া তিন হাজারের মতো। এর মধ্যে বিদেশী ভ্রমণকারী ছিল ২৯ জন। সূত্রটি আরো জানায়, এসব ভ্রমণকারীর কাছ থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার রাজস্ব আহরণ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে অন্তত তিন গুণ। গত দুই মাসে ২০ হাজারের অধিক পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। গড়ে প্রতি মাসে ১০ হাজারের বেশি পর্যটকের আগমন এভাবে অব্যাহত থাকলে পুরো বছরে এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

এদিকে চলতি বছর থেকে সুন্দরবন ভ্রমণ কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। গত বছর পর্যন্ত সুন্দরবন ভ্রমণে জন প্রতি ৭৫ টাকা করে সরকারি কর ধার্য ছিল, যা চলতি বছরের শুরু থেকে দ্বিগুণ অর্থাৎ জনপ্রতি ১৫০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বনবিভাগের সাতক্ষীরা বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ কর্মকর্তা আবু হাসান বণিক বার্তাকে জানান, চলতি মৌসুমে সুন্দরবনে পর্যটকের আগমন বেড়েছে। প্রতিদিন দেশ ও দেশের বাইরে থেকে পর্যটক আসছেন সুন্দরবন ভ্রমণে। এজন্য সাতক্ষীরায় বনবিভাগের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের ইকোট্যুরিজম কলাগাছিয়ায় পর্যটকের বিভিন্ন সুবিধার পাশাপাশি ফুট ট্রেইলর পাকাকরণ, হরিণ ও কুমিরের বেষ্টনী নির্মাণ, স্যুভেনির শপ, গোলাঘর এবং বেঞ্চ করা হচ্ছে। যদিও পর্যটকদের চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা অংশে পর্যটকের আগমন যে হারে বাড়ছে তাতে করে আরো নতুন নতুন এবং পরিবেশবান্ধব ইকোট্যুরিজম স্পট নির্মাণ করতে হবে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ হুমায়ুন কবির জানান, ভ্রমণকারীদের কাছে সুন্দরবন খুবই আকর্ষণীয়। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ যাতে ধ্বংস না হয় দর্শনার্থীদের সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। তিনি আরো বলেন, আগামীতে সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটকদের আরো আকর্ষণ করে তুলতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হবে। তাছাড়া সুন্দরবন রক্ষায় যা যা করণীয় প্রশাসনের তরফ থেকে সে ব্যাপারেও কাজ করা হবে।