অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক প্রবৃদ্ধির হার প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। এর ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশাল এ কর্মযজ্ঞ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন ১
বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে ওঠা চরগুলো সাগরের নোনাজলের প্রভাবে ছিল চাষাবাদের অনুপযোগী। জমির উপযোগিতা সীমাবদ্ধ ছিল শুধু গবাদিপশুর বিচরণ ও মত্স্য চাষে। তবে এ চরগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। সন্দ্বীপ চ্যানেল ঘেঁষে গড়ে ওঠা চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনীর সোনাগাজীর চরাঞ্চলে দৃশ্যমান হচ্ছিল ৩০ হাজার একর জমির ওপর নির্মীয়মাণ শিল্পনগরটি। পরিকল্পিত শিল্পায়নের এ বিশাল কর্মযজ্ঞেও ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব। করোনা-পরবর্তী পরিবর্তিত বাস্তবতা শিল্পনগরীটির বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা, সে বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
তাদের ভাষ্যমতে, কভিড-১৯-এর আগের ও পরের বৈশ্বিক পরিস্থিতি কোনোভাবেই এক নয়। মহামারীর প্রাদুর্ভাব গোটা বিশ্ববাসীর জীবন ব্যবস্থাকেই বদলে দিতে শুরু করেছে। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনায়ও এখন পরোক্ষভাবে হলেও এর প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনছেন। দূরবর্তী স্থানকে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়ার আগে বাইরের বিনিয়োগকারীরাও এখন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সুবিধাসহ নতুন নতুন আঙ্গিক নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছেন। সব মিলিয়ে বর্তমান পৃথিবীতে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ভাবনা করোনা-পূর্ববর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে মিলছে না। ফলে মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সাময়িকভাবে হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কভিড সুরক্ষা নিশ্চিত সাপেক্ষে শিল্পনগরীটির সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলেও প্রত্যাশা করছেন তারা।
সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরীকে ঘিরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে শিল্পনগরীতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও নীতিমালায় পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এখন তাদের প্রকল্প পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। মহামারীর প্রাদুর্ভাব তাদের বিনিয়োগ ভাবনায় পরিবর্তন আনতে আরো বেশি বাধ্য করেছে। আবার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও কেউ কেউ এখন পরিকল্পনা বদলে নিজ দেশের নিকটবর্তী দেশ বা স্থানে বিনিয়োগ শুরু করেছেন (নিয়ারশোরিং)। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ভিয়েতনামে নতুন এমন অনেক বিদেশী বিনিয়োগ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, শুরুতে যার প্রকৃত গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আগে চাইলেই আসতে পারতেন। কিন্তু কভিড পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কারণেই তারা চাইলেও আসতে পারছেন না। এর একটা প্রভাব রয়েছে। তার পরও বাংলাদেশের আশা রয়েছে। কারণ কভিড পরিস্থিতিতেও বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে, যা অপ্রত্যাশিত। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। ফলে দেশী-বিদেশী সবারই এ শিল্পনগরী নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। আশা করছি মার্চ-এপ্রিলের পর একটা বড় পরিবর্তন দেখা যাবে।
তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) দাবি, কভিডের প্রভাব অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে তেমন একটা পড়েনি। সংস্থাটি বলছে, শুধু মিরসরাই বা বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী নয়, গোটা দেশেরই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে ঘিরে প্রণীত সামগ্রিক পরিকল্পনায় করোনার তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব নেই।
বেজা বলছে, গত বছর সব মিলিয়ে ৪০৮ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু করোনাকালেই জমা হয়েছে প্রায় ৩১৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব। করোনাকালে জমা হওয়া এসব প্রস্তাবের মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগ প্রকল্প আছে ৫৪ কোটি ৫২ লাখ ডলারের। স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ২৬৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ।
করোনাকালে অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতি প্রসঙ্গে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরীর বক্তব্য হলো, করোনাকালীন বিনিয়োগের এ সুবাতাস প্রমাণ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিনিয়োগের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। বর্তমান সরকারের স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে বিনিয়োগের আদর্শ স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে বিনিয়োগের এ প্রবাহ চলমান থাকলে আগামী বছর বিনিয়োগকারীদের শিল্পে ব্যবহারের জন্য চাহিদামাফিক জমি দেয়া আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর হবে আগামী বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের রাজধানী।
বেজার সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে এখন পর্যন্ত দেশী-বিদেশী মিলিয়ে মোট ৬৪টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মোট পরিমাণ ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি। এ বিনিয়োগের ৬০ শতাংশই এসেছে দেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন শিল্পনগরে এরই মধ্যে ১৮টি কালভার্ট পুনর্নির্মাণ বা নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া ১০ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজের অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ। এছাড়া গ্রিড লাইন নির্মাণকাজ এবং সমুদ্রবন্দর ও রেল সংযোগের সম্ভাবনা যাচাইয়ের কাজও শেষ হয়েছে। বর্তমানে গ্যাস সংযোগের কাজ চলছে।
বেজা জানিয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে শুধু এ শিল্পনগরেই নতুন করে কর্মসংস্থান হবে ১ লাখ ৬৩ হাজার জনের।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়া বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম চীনের ইয়াবাং গ্রুপ। চীনের অন্যতম শীর্ষ এ শিল্প গ্রুপের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৫০০টি। তাদের পরিচালন আয় ৪৫০ কোটি ডলার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে টেক্সটাইল ও অন্যান্য রাসায়নিক শিল্প স্থাপনের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইয়াবাং ইনভেস্টমেন্ট হোল্ডিংস গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড। প্রস্তাবিত এ বিনিয়োগ বাস্তবায়নে ১০০ একর জমি ইজারা চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে প্রস্তাবিত ৬৪টি প্রকল্পের মধ্যে বেশ কয়েকটির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, জাপানের নিপ্পন, চীনের জুজুই জিনইয়ান কেমিক্যাল, দেশীয় উদ্যোগের ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং, বসুন্ধরা কেমিক্যাল, বসুন্ধরা প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড, মডার্ন সিনট্যাক্স, এসকিউ গ্রুপের টেকনো ইলেকট্রিক্যালস, ভিকার ইলেকট্রিক্যালস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এসব প্রকল্প অবকাঠামো উন্নয়ন পর্যায়ে আছে। ন্যূনতম দুই মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর।
এ বিষয়ে শিল্পনগরীর বিনিয়োগকারী স্টার অ্যালাইড ভেঞ্চার লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজ চলছে। এ ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের উন্নয়নও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আমরা আশা করি চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় নীতি ও অবকাঠামো সংকটসহ সব ধরনের সংকট কেটে যাবে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। কভিডে সাময়িকভাবে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হলেও আগামী চার-পাঁচ মাসে দৃশ্যপট বদলে যাবে বলে আশা করছি।










