চট্টগ্রাম নগরীর নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে চকবাজার প্রবেশে দেড় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজের অনুমোদন পায় ২০১৬ সালে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদার জটিলতার কারণে সাড়ে ছয় বছরেও শেষ করা সম্ভব হয়নি সড়কটির নির্মাণকাজ। অন্যদিকে সড়কটির কাজ সম্পন্ন করতে দুই দফা সময় বাড়িয়ে কাজ শেষ না হওয়ায় নতুন করে তৃতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে দুই বছর সময়। মূলত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রাথমিক নকশা সরেজমিন পরিদর্শনে না গিয়ে অনুমোদন করায় সড়কটি নির্মাণে তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। সড়কটি নির্মাণকাজের সময় বারবার বৃদ্ধি পাওয়ায় সিডিএ এবং ঠিকাদারের কাজের সময়ক্ষেপণ নিয়ে বিব্রত নগর পরিকল্পনাবিদরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কটি নির্মাণের প্রধান প্রতিবন্ধকতা সিডিএর নকশা। নকশায় কোনো ভবন না থাকলে আরো আগেই কাজ সম্পন্ন হয়ে
যেত। তবে নকশা চূড়ান্ত করার আগে কেন সিডিএ সরেজমিন পরিদর্শন করে বিষয়টির সমাধান করল না সেটি নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। এটাকে সিডিএর ব্যর্থতা বলে মনে করছেন তারা।
সিডিএ সূত্রে জানা গিয়েছে, চট্টগ্রাম নগরীতে যানজট কমানো এবং বাকলিয়া এলাকা থেকে কক্সবাজারমুখী মানুষের যাতায়াতের সুবিধা কারণে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় দেড় কিলোমিটার প্রশস্ত এবং ৬০ ফুট চওড়া সড়কটি নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ২০৫ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের জন্য ৪৩৭ দশমিক ৩৩ কাঠা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পটিতে রি-টেইনিং ওয়াল ১ দশমিক ২২২ কিলোমিটার নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ক্রস কালভার্ট আটটি ও পিসি ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে একটি।
এদিকে ২০১৭ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলে সড়কের নির্মাণে যে নকশা তৈরি করা হয় সেই নকশার মধ্যে একটি ১০ তলা ভবনের অস্তিত্ব পান প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। অথচ সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান (১৯৯৫) অনুযায়ী সেখানে সড়ক থাকার কথা ছিল। এ ভবনকে কেন্দ্র করে সড়কটি নির্মাণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। পরে ভবন মালিককে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১১ কোটি টাকা দিয়ে ভবনটি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে আইনি জটিলতায় ভবনটি ভাঙা সম্ভব হয়নি।
২০১৯ সালের জুন মাসে প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও প্রথম সংশোধিত মেয়াদে কাজের সময় এক বছর বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরবর্তীকালে কভিড মহামারীর কারণে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তৃতীয়বারের মতো সংশোধিত মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নতুন করে সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২২০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। নতুন নকশায় ভবনটি না ভেঙেই দক্ষিণ দিকে সড়কটির নির্মাণকাজ করছে সিডিএ।
সরেজমিন নির্মাণাধীন বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির বাকলিয়ার শাহ আমানত অংশের সড়ক নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও চন্দনপুরা ও সিরাজউদ্দৌলা সড়ক অংশের প্রায় অর্ধকিলোমিটার অংশে বালি ফেলে রাখা হয়েছে। এ বালি ফেলা অংশের কাজ শেষ হতে বেশকিছু সময় লাগবে। তাছাড়া ভবনটির দক্ষিণ পাশের নতুন অধিগ্রহণ করা জমিতে সড়কের ওপরও বালি ফেলা হয়েছে।
স্থানীয় মো. শরীফুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, সড়কটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে আন্দরকিল্লাহ এলাকা থেকে নতুন ব্রিজ যেতে সময় লাগবে পাঁচ-ছয় মিনিট। আমরা যারা শাহ আমানত নতুন ব্রিজ যাতায়াত করি তাদেরও বহদ্দারহাট হয়ে কিংবা চাক্তাই খাতুনগঞ্জ হয়ে কোতোয়ালি ঘুরে যেতে হয়। সিডিএর পরিকল্পনার ভুলে সড়কটি ছয় বছরেও শেষ করা যায়নি। আমাদের দাবি দ্রুত সড়কের কাজ সম্পন্ন করা হোক।
সিডিএর কর্মকর্তারা জানান, মূলত সড়কের নির্মাণকাজ করতে গিয়ে ১০ তলা ভবনটি সামনে চলে আসে। কিন্তু মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সড়কের জন্য বরাদ্দ করা জায়গায় ভবনটি থাকার কথা নয়। পরে ভবনটি সরিয়ে মালিককে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সড়কটি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজ সম্পন্ন হয়নি। তবে ভবনটি রেখেই চুয়েটের নতুন নকশা অনুমোদন করা হয়। নকশা অনুমোদন কমিটি ভবনটির দক্ষিণ পাশে রাস্তা নির্মাণের সুপারিশ করে। পরে ওই সুপারিশ অনুযায়ী সড়কের নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। নতুন মেয়াদের মধ্যেই কাজ শেষ হবে বলে জানান তারা।
প্রকল্পটির পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী কাদের নেওয়াজ জানান, প্রকল্পটি পাসের পরই কাজ শুরু করা হয়েছিল, কিন্তু সড়কের মাঝপথে একটি ভবনের কারণে সড়ক নির্মাণে সময় বেশি লেগেছে। তাছাড়া কভিড পরিস্থিতির কারণে আমরা কাজ করতে পারিনি। তবে নতুন যে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে সে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে। তাছাড়া প্রথম ঠিকাদার মীর আকতার ডিপিপি অনুযায়ী তাদের কাজ সম্পন্ন করেছে। নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে বাকি ৪০০ মিটার সড়ক নির্মাণকাজ যথাসময়ে শেষ হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সড়কটি নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তাহলে প্রকল্প পাসের আগে কেন সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়নি। প্রকল্প পাসের পরে সেখানে নকশার মধ্যেই ১০ তলা ভবন দেখা গিয়েছে। সিডিএর মাস্টারপ্ল্যানে যদি এখানে রাস্তা থাকে তাহলে সেখানে ভবন কীভাবে এলো। এ ভবন অপসারণ কিংবা ক্ষতিপূরণ জটিলতার কারণে কাজের তিন বছর নষ্ট হয়েছে। সময় বাড়ার ফলে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে। এখন সে ভবন রেখেই তার পাশ দিয়ে সড়ক নির্মাণকাজ চলছে। সব মিলিয়ে অর্থ এবং সময় দুটিই অপচয় করেছে সিডিএ।
উল্লেখ্য, নগরীর আন্দরকিল্লাহ থেকে চন্দনপুরা মসজিদ এলাকার বিপরীত পাশে সড়কটি চাক্তাই খালের ওপর দিয়ে মৌসুমি আবাসিক, বগারবিল হয়ে সৈয়দ শাহ রোড হয়ে পুরনো বাকলিয়া থানার পাশ দিয়ে সংযোগ সড়কের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। সড়কটি চালু হলে মাত্র পাঁ-ছয় মিনিটে নতুন ব্রিজ বা আন্দরকিল্লাহ আসা-যাওয়া করা যাবে।










