বাংলাদেশের বৃহত্তম দুই বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে ঘিরে দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অঞ্চলটিকে নিয়ে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে চরম কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ দুই পরাশক্তি। যতই দিন যাচ্ছে, ততই এ অবস্থান আরো কঠোর হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সক্রিয়তাও দিনে দিনে জোরালো হয়ে উঠছে, বিশেষ করে ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে। এমনকি সামনের দিনগুলোয় দুই দেশ এ নিয়ে মেরুকরণের প্রয়াসও চালাতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পর্যবেক্ষকদের একাংশ। সেক্ষেত্রে বিষয়টি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশ দুটির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাটাই হয়ে দাঁড়াতে পারে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

তাইওয়ান ইস্যুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরো চরমে উঠলে দুই দেশের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিটি দেশকেই এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিশ্লেষকরা। দ্বীপাঞ্চলটিকে নিয়ে আগেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। ২০০৪ সালে তত্কালীন সরকারের কয়েকজন নীতিনির্ধারকের তত্পরতায় ঢাকায় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক দপ্তর খোলার অনুমতি পায় তাইওয়ান। ওই সময় বিষয়টি বেইজিংকে বেশ ক্ষুব্ধ করে তোলে। বলা হয়, তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পেছনে বিষয়টি বেশ বড় ভূমিকা রেখেছিল।

দক্ষিণ চীন সাগরের পরিস্থিতি এ মুহূর্তে বেশ বিপজ্জনক এক অবস্থায় রয়েছে। তাইওয়ান দখলে চীনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন’ নীতি থেকে বের হয়ে আসবে না বলে ঘোষণা দিলেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাইওয়ান আক্রান্ত হলে তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসবে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞরা  বলছেন, পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে শিগগিরই তাইওয়ান নিয়ে নতুন করে ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো নিরপেক্ষ দেশগুলোর ওপরও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো অবস্থান গ্রহণের চাপ বাড়বে। সেক্ষেত্রে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে চলাটাই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বর্তমানে তাইওয়ানের সঙ্গে কোনো দেশের যেকোনো কূটনৈতিক তত্পরতাকে সন্দেহের চোখে দেখছে চীন। এ নিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়াও আসছে অত্যন্ত তীব্রভাবে। চলতি বছরের আগস্টে তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দপ্তর খোলার ঘোষণা দেয় লিথুয়ানিয়া। একইভাবে তাইওয়ানও বাল্টিক সাগরতীরবর্তী দেশটির রাজধানী ভিলিনিয়াসে একই ধরনের একটি দপ্তর খোলার ঘোষণা দেয়। বিষয়টিতে এরই মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। লিথুয়ানিয়া থেকে চীনা রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে চীন। দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের পাশাপাশি এ নিয়ে বেশ খোলাখুলি হুমকিও জানিয়েছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, যারাই তাইওয়ানের  বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করবে, তাদের সবাইকে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। দুই দেশই বাণিজ্য খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুই অংশীদার। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে রফতানি পণ্যের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া দেশে আমদানীকৃত পণ্যের উৎস হিসেবে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে দেশটি। গত অর্থবছরে (২০২০-২১) দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য হয়েছে ৯২৪ কোটি ২২ লাখ ৮ হাজার ৬৫৩ ডলারের। এর মধ্যে রফতানি হয়েছে ৬৯৭ কোটি ৪০ লাখ ৮ হাজার ৬৫৩ ডলারের পণ্য। অর্থমূল্য বিবেচনায় দেশের মোট পণ্য রফতানির ১৮ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া এ সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২২৬ কোটি ৮২ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি হয় চীন থেকে। শিল্প-কলকারখানার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে দেশে ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশের বাজার দাঁড়িয়ে আছে অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভর করে। অর্থমূল্য বিবেচনায় দেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। গত অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য হয়েছে ১ হাজার ৩৬০ কোটি ৫৮ লাখ ৫৭ হাজার ৯০৫ ডলারের। এর মধ্যে রফতানি হয়েছে ৬৮ কোটি ৬ লাখ ৫৭ হাজার ৯০৫ ডলারের। আমদানি হয়েছে ১ হাজার ২৯২ কোটি ৫২ লাখ ডলারের পণ্য।

তাইওয়ান নিয়ে কোনো ধরনের সংঘাত শুরু হলে বাংলাদেশ কোনোভাবেই সেখানে জড়িয়ে পড়বে না বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবসময়ই বলে এসেছে, সংঘাত কোনো সমাধানের পথ নয়। তাছাড়া আমরা বরাবরই কূটনীতিতে একটি বিষয় মেনে এসেছি, সেটি হলো সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত হিসেবেই দেখি। চীনের ক্ষেত্রেও তা-ই। এক্ষেত্রে অন্যের শত্রুকে আমরা কখনই আমাদের শত্রু হিসেবে নিইনি। এরই কারণে যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বাংলাদেশের কাছে আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর দাবি করেছিল, আমরা দিইনি। আবার চীন ও ভারতের মধ্যে যখন গালওয়ান উপত্যকায় সংঘাত শুরু হলো, তখনো আমরা কারো পক্ষ নিইনি। অন্যদিকে চীন-মিয়ানমারের মধ্যকার সুসম্পর্ক নিয়েও আমরা কখনো কোনো কথা বলিনি। সহজ কথা অন্যের বন্ধুত্ব বা শত্রুত্বের বিষয়গুলোর মধ্যে আমরা নেই। আমরা মূলত আমাদের উন্নয়ন নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি।

চীনে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে সংঘটিত এক বিপ্লবে ১৯৪৯ সালে ক্ষমতা দখল করে কমিউনিস্ট পার্টি। ওই সময়ে ক্ষমতাচ্যুত চিয়াং কাইশেক সরকারের কর্তাব্যক্তিরা ফরমোজা দ্বীপে পালিয়ে এসে চীনা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন, যা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় তাইওয়ান হিসেবে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এখনো স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে খুব একটা স্বীকৃত নয় তাইওয়ান। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের সদস্য ১৩টি দেশ তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি ওয়াশিংটনের কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি পায়নি তাইওয়ান। বরং যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই নিজেকে ‘এক চীন’ নীতির সমর্থক বলে দাবি করেছে। যদিও তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে হোয়াইট হাউজের বিভিন্ন প্রশাসন বরাবরই দাবি করে এসেছে।

অন্যদিকে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের দাবি তুলে এসেছেন ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা। এ দাবিতে নিমরাজি নন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও। গত কয়েক মাসে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক তত্পরতা বাড়িয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে আপত্তি তুললেও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এ চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করেই তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করে নেবে চীন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তাইওয়ানকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিতে গত সাত দশকের বিদ্যমান ভারসাম্য এখন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। দ্বীপাঞ্চলটির ভাগ্য নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতেই এর বড় ধরনের প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।