কভিড প্রতিরোধে দেশে এ পর্যন্ত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৫ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা মোট প্রয়োগকৃত টিকার ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। সম্প্রতি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ ওঠায় নিজেদের তৈরি ওই টিকা বাজার থেকে তুলে নিচ্ছে ব্রিটিশ-সুইডিশ বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল এবং বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠানটি। এ নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগের বিষয়টি আমলে নিয়েছে সরকার। অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে কোনো ধরনের সমস্যা রয়েছে কিনা তা যাচাইয়ে কর্মকৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রস্তুতকৃত টিকাটি ‘কোভিশিল্ড’ নামে উৎপাদন করে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট। আর ইউরোপে তৈরি একই টিকার নাম ‘ভ্যাক্সজেভরিয়া’। বিশ্বে প্রথম করোনার এ টিকাটি মানবদেহে প্রয়োগ করা হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। সপ্তাহ তিনেকের মাথায় বাংলাদেশেও পরীক্ষামূলকভাবে এর প্রয়োগ শুরু করে সরকার। এর ১০ দিন পরই গণপরিসরে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়।
দেশে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রয়োগের ফলে গ্রহীতাদের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করতে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ফার্মাকোভিজিল্যান্স পরিচালনা করা হবে। মূলত প্রতিকূল প্রভাব বা অন্য কোনো ওষুধ ও টিকাসংক্রান্ত সমস্যা শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ, প্রতিরোধ সম্পর্কিত বিজ্ঞান ও কার্যক্রমকে ফার্মাকোভিজিল্যান্স বলা হয়।
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে এরই মধ্যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে গতকাল বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে যে অভিযোগ উঠেছে তার বিষয়ে আমরা অফিশিয়ালি কিছু জানি না। তবে যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা যাচাই করে দেখছি। করোনার টিকাগ্রহীতাদের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। এ টিকার সাড়ে পাঁচ কোটি ডোজের বেশি প্রয়োগ করা হয়েছে। তাই আমরা দ্বৈচয়নের ভিত্তিতে তাদের ফোন করব। জেলা-উপজেলা, শহর-গ্রাম বিভিন্ন অঞ্চলে টিকাগ্রহীতাদের কাছে জানতে চাইব, তারা কোনো সমস্যা বোধ করেন কিনা। আর সমস্যা থাকলে তা আদতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিনা তা যাচাই করবে বিশেষজ্ঞ দল। গ্রহীতার মেডিকেল ইতিহাসও দেখা হবে। পরে প্রতিবেদন আকারে আমরা প্রকাশ করব। এ কাজটি হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা শাখা (এমআইএস), পরিকল্পনা ও গবেষণা শাখা, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সমন্বয়ে।’
ওষুধ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার জরুরি অবস্থায় অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে তা খুবই বিরল। ৫০ হাজারে তা একজনের মধ্যে দেখা দিতে পারে। বিষয়টি এখন পর্যবেক্ষণ করলে বস্তুত ক্ষতি নেই, কেননা তাতে দেশের কর্তৃপক্ষের অভিজ্ঞতা বাড়বে। দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণে আলাদা একটি পরিকল্পনাও হাতে নেয়া যেতে পারে। এতে টিকা, টিকা প্রয়োগসম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বাড়বে।
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, এটি যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটির নাম অ্যাডভার্স ইভেন্ট ফলোইং ইমিউনাইজেশন (এইএফআই)। এ নজরদারি দুভাবে করা হতে পারে। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ওষুধের কারণে হয়েছে বলে সন্দেহ করলে তা নির্দিষ্ট ফরম পূরণের মাধ্যমে ওষুধ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সেলকে অবহিত করতে পারেন যে কেউ, যাকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ নজরদারি বলা হয়। যদিও দেশে এখনো এ ধরনের অবহিতকরণের হার উদ্বেগজনকভাবে কম। আর সক্রিয় বা প্রত্যক্ষ নজরদারির জন্য নমুনা কাঠামো অনুসরণের মাধ্যমে সন্দেহজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়। তাছাড়া কোনো সুনির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে সবাইকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে।
অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের টিকাদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা থাকলেও সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রচলিত সুবিধা দিয়ে পাশ্বর্প্রতিক্রিয়া চিহ্নিত ও নিশ্চিত করার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবুও টিকার সন্দেহজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জনমনে আস্থা রক্ষার জন্য সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করা দরকার। টিকাদানকারী কর্তৃপক্ষ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তবে বিশ্লেষণ ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রণয়নের কাজ এক বা একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত গবেষণা কনসোর্টিয়াম দিয়ে পরিচালনা করানো হলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।’
দেশে টিকা অনুমোদন ও প্রয়োগের বিষয়ে সরকারের পরামর্শক হিসেবে কাজ করে থাকে টিকাসংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি (নাইট্যাগ)। বিভিন্ন বিষয়ে এ কমিটিতে ১৭ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ কাজ করছে। কমিটির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে জানান, বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করেই দেশে এখন ফাইজার ব্যতীত অন্য কোনো টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে না।
অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কোনো পরামর্শ চেয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুসন্ধানে আমাদের সরাসরি তেমন ভূমিকা নেই। যেসব এলাকায় এ টিকা দেয়া হয়েছে তাদের মেডিকেল হিস্ট্রি কী আছে তা দেখতে হবে। ওই টিকা নেয়ার পর রক্ত জমাট বেঁধে কেউ অসুস্থ হয়েছেন কিনা তা হাসপাতালে পাওয়া যাবে। তবে স্বাস্থ্য বা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে কোনো পরামর্শ আমাদের কাছে এখনো চায়নি। পরামর্শ চাইলে আমরা মতামত দেব।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, নিয়মিতভাবে দেশে এখন টিকা কার্যক্রম চলমান। কারিগরি পরামর্শক কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী দেশে এখন শুধু ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে। আর অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সর্বশেষ প্রয়োগ করা হয় অন্তত দেড় বছর আগে।
দেশে ২০২১ সালে যখন অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রয়োগ করা হয় তখন নাইট্যাগের সদস্য ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যালোচনায় কী করতে হবে তা জানতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাইট্যাগকে লিখতে পারে। তখন এ কমিটি উপকমিটি করে সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে নাইট্যাগের মাধ্যমে সরকারকে উপস্থাপন করবে, পরামর্শ দেবে। আদতে তা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিনা তা বিশ্লেষণ করতে হবে।’
টিকার যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলা হচ্ছে তা জানতে খুব বেশি খরচ হবে না জানিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যারা টিকা নিয়েছেন তাদের যাবতীয় তথ্য রয়েছে। দ্বৈচয়নের ভিত্তিতে তাদের কাছ থেকে সমস্যা জানা যেতে পারে। অন্যদিকে রক্ত জমাট বাঁধার, স্নায়ুর অসাড়তা নিয়ে কোনো রোগী এলে নিউরো মেডিসিন ও নিউরো সার্জনরা খোঁজ নিতে পারেন তারা ওই টিকা নিয়েছিলেন কিনা। মূলত প্রক্রিয়া মেনে কাজ করতে হবে। অন্যথায় বিক্ষিপ্তভাবে তথ্য নিলে তা উপস্থাপনযোগ্য হবে না। এখানে তাড়াহুড়ার কিছু নেই। আবার বিষয়টিকে গুরুত্বহীনভাবে দেখারও কিছু নেই।’










