করোনাকালে সাতক্ষীরায় রফতানিজাত বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বেড়েছে। একই সঙ্গে চিংড়ির অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রসারও ঘটেছে। এ সময় জেলায় রফতানিজাত বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টন। যার অভ্যন্তরীণ বাজারমূল্য ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বেশি। পরিকল্পিত চাষ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে চিংড়ি চাষ বেড়েছে বলে দাবি মৎস্য বিভাগের। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে চিংড়ি কেজিপ্রতি ৮০০-৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ৪৮ হাজার ৬০৫ টন। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৮৮ টন ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৫১৭ টন, যার অভ্যন্তরীণ বাজারমূল্য ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

সূত্রটি আরো জানায়, ২০১৮-১৮ অর্থবছরে জেলায় বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল ২১ হাজার ২৩২ টন। সে হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে যখন মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাব চলছে তখন অর্থাৎ ওই দুই বছরে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন বেড়েছে অন্তত ৬ হাজার টন।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গুনাকরকাঠি গ্রামের চিংড়িচাষী আব্দুল বারী বলেন, প্রায় ১৫০ বিঘার একটি চিংড়িঘের রয়েছে তার। ১৫-২০ বছর যাবত ওই ঘেরে চিংড়ি চাষ করে আসছেন তিনি। ২০১৬-১৯ পর্যন্ত একাধারে কম-বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে চিংড়ি উৎপাদন করে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বৈদেশিক বাজারে চিংড়ির দাম না থাকার  পাশাপাশি উৎপাদন কমে যাওয়া। কিন্তু দুই বছরে চিংড়ি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় করোনাকালে চিংড়ির উৎপাদন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারে সন্তোষ্টজনক দাম ছিল। করোনার আগে যে রফতানিজাত বাগদা চিংড়ির দাম ছিল কেজিপ্রতি ৬০০-৬৫০ টাকা, তা গত দুই বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে দাম পাওয়া গেছে ৯০০-৯৫০ টাকা কেজি। যদিও এ সময় দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব ছিল বেশি। উৎপাদনও এ সময় বেশ ভালো হয়েছে।

জেলার দেবহাটা উপজেলার শ্যামনগর এলাকার চিংড়িচাষী আবু বকর সিদ্দিকি জানান, ৮০ বিঘার একটি ঘেরে বাগদা চিংড়ি চাষ করেন তিনি। তুলনামূলক অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে করোনাকালীন চিংড়ির ভালো দাম পেয়েছেন। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রব জানান, করোনাকালে বাগদা চিংড়ির অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরির পাশাপাশি দামও ভালো পাওয়া গেছে। বর্তমান বাগদা চিংড়ি ৯০০ টাকার বেশি পাইকারি দর যাচ্ছে, যা করোনার আগে বাজার দর ছিল ৬০০-৬২০ টাকা। কিন্ত এ সময় দেশীয় বাজার সৃষ্টি হয়েছে চিংড়ির।

বাংলাদেশ চিংড়ি চাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বাবলা বলেন, কয়েক বছরের মধ্যে বর্তমানে চিংড়ির দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। শুধু আন্তর্জাতিক বাজারেই নয়, আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও বাগদা চিংড়ির দাম যথেষ্ট ভালো। বিশেষ করে করোনাকালে অভ্যন্তরীণ বাজার প্রসারিত হয়েছে ।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান জানান, গেল দুই বছরে শুধু উৎপাদনই বাড়েনি বরং বাগদা চিংড়ির অভ্যন্তরীণ বাজারও   তৈরি হয়েছে। এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে চাষীরা লাভবান হবেন। জেলায় পরিকল্পিত চিংড়ি ঘেরের খুবই অভাব। তিনি বলেন, চিংড়ি উৎপাদন ও গুণগতমান ভালো রাখতে হলে অবশ্যই পরিকল্পিত উপায়ে চিংড়িঘের করতে হবে। চিংড়ির রেণু অবমুক্ত করার আগে ঘেরের তলা শুকিয়ে পরিষ্কার করার পাশাপাশি কমপক্ষে সাড়ে চার-পাঁচ ফুট পানি রাখতে হবে। কিন্তু এ জেলায় একেকটি ঘেরে যুগ যুগ ধরে চিংড়ি চাষ করে আসছেন চাষীরা। কিন্তু তলার জীবাণুমুক্ত করা হয় না। পাশাপাশি পানিস্বল্পতার কারণে চিংড়ি ঘেরে নানা ধরনের মড়ক দেখা দেয়। এতে চাষীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি রফতানিও হ্রাস পাচ্ছে।