কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর ও মিরপুরের তালবাড়িয়া এলাকায় পদ্মা থেকে গড়াইয়ের উৎসমুখ শুরু হয়েছে। কুষ্টিয়া ছাড়াও ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোরসহ বেশ কয়েকটি জেলা হয়ে দক্ষিণে সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হয়েছে নদটি। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বড়ুরিয়া গ্রামটির অবস্থান নদের তীরেই। গত দুই দশকে অব্যাহত ভাঙনে জনবহুল গ্রামটির অর্ধেকের বেশি অংশ নদে বিলীন হয়ে গেছে।
নদের তীরবর্তী বাসিন্দারা বলছেন, গ্রামটিতে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ বিঘা। গড়াই নদের ভাঙনে জমির পরিমাণ নেমে এসেছে ২৫০ বিঘায়। গ্রামটিতে ৭০০ পরিবারের বসবাস ছিল। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেকেই অন্যত্র বসতি স্থাপন করেছেন। কেউ বসবাস করছেন সরকারি জমিতে। বর্তমানে ২০০টি পরিবার বাস করছে ওই গ্রামে।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নদের প্রবাহমান অংশ ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ছয় কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ। তবে ভাঙনের তীব্রতা বেশি বড়ুরিয়া গ্রামের দেড় কিলোমিটার অংশে। কোথাও বেশি কোথাও কম, সে হিসাবে প্রতি বছর গড়ে গ্রামটির ৫ মিটার অর্থাৎ ১৫ ফুট নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এরই মধ্যে গ্রামের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিলীন হয়ে গেছে। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা অংশে জেগে ওঠা চরেও চাষাবাদ করতে পারছে না বড়ুরিয়া গ্রামের মানুষ। বর্ষার শুরুতে ভাঙন শুরু হয়। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙনও বৃদ্ধি পায়। আবার পানি কমে যাওয়ার সময় তা তীব্র আকার ধারণ করে। নদীর এমন ভয়াবহ ভাঙন আর কোথাও নেই। কিন্তু ভাঙন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্টরা।
বড়ুরিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নদীর ওপারে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গনেশপুর আদর্শ গ্রাম। আমাদের জমি ভেঙে ওপাশে জেগে ওঠা চরে কুষ্টিয়ার মানুষ যেতে দেয় না। আমাদের চর উদ্ধারেও কেউ ব্যবস্থা নেয় না। ভাঙন রোধে স্থায়ী উদ্যোগ নিলে দুর্ভোগ কমে যেত।’
ইসহাক মণ্ডল বলেন, ‘দুই দশকে আনসার আলী, আজাদ হোসেন, তারেক আলী, আবদুল মান্নান, রবিউল ইসলাম, সামছুল আলমসহ অসংখ্য পরিবার গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। একইভাবে কৃষ্ণনগর গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। কেউ অন্যত্র জমি কিনে ঘর করেছেন। আবার কেউ সব হারিয়ে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করছেন। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়া হলে নদের তীরে এখনো যারা বসবাস করছেন, তাদেরও অন্যত্র চলে যেতে হবে।’
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও লবণাক্ততা রোধে গড়াইয়ের রয়েছে অপরিহার্য ভূমিকা। এ নদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা। মূলত ১৯৬২ সালের পর থেকে নদে ভাঙন শুরু হয়। তবে গত ২০ বছরে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে কয়েক গুণ। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী বড়ুয়া মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ১ হাজার ৪৫৭ বিঘা। আর খাসজমি রয়েছে ১৪৩ বিঘা। ভাঙনের ফলে এখন জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫০ বিঘায়।
শুধু বড়ুরিয়া নয়, নদের তীরবর্তী অন্তত ১০ গ্রামেও দেখা দিয়েছে ভাঙন। এর মধ্যে কৃষ্ণনগর, গোসাইডাঙ্গা, মাদলা, মাঝদিয়া, নলখোলা, উলুবাড়িয়া, চরপাড়া, সুন্দরপুর ও লাঙ্গলবাঁধ বাজার এলাকা ভাঙনপ্রবণ। ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, জমি উদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। না হলে শৈলকুপার মানচিত্র থেকে একদিন চিরতরে মুছে যাবে বড়ুরিয়াসহ ১০টি গ্রাম।
গড়াই নদের তীরবর্তী কৃষ্ণনগর গ্রামের আবদুর রহিম মণ্ডল বলেন, ‘ভাঙনের কারণে বসতবাড়ির জায়গা বদলেছি ছয়বার। আমার আট বিঘা জমি ছিল। পাকা ঘর ছিল। গরু-ছাগলও ছিল। এখন অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে। সবকিছু চলে গেছে গড়াই নদে।’
একই গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গড়াই নদ আগে অনেকটা উত্তরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে দক্ষিণে কৃষ্ণনগর গ্রামের মাঝে চলে এসেছে। আগে আমাদের ঘরবাড়ি নদের যে স্থানে ছিল, সেখানে এখন চর। সেখানে কুষ্টিয়া থেকে কিছু পরিবার এসে বসবাস করছে। আমরা দক্ষিণে সরে গিয়ে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছি।’
পাউবো কর্তৃপক্ষ বলছেন, ২০১৯ ও ২০২১ সালে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে দাখিল করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। চলতি বছরে গড়াইয়ের ভাঙন রোধে অস্থায়ী ভিত্তিতে সমীক্ষা কাজের আওতায় ১৭৫ কেজি ওজনের জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ১ জুন থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২৬ সালের জুনে। ১৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে চার ধাপে।
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ষার শুরুতে ভাঙন রোধে অস্থায়ী সমীক্ষা কাজ চলমান রয়েছে। আগামী বছরের জুন পর্যন্ত কয়েকটি ধাপে জিও ব্যাগ ফেলার কাজটি চলবে। এরপর স্থায়ী কাজ করা হবে বরাদ্দের ভিত্তিতে। নদের এ অংশটুকু অবতল হওয়ায় পানির চাপ বৃদ্ধিতে পলি সরে ভাঙন দেখা দেয়।’










