স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে দেশের আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ২০১৬ সালে প্রকল্প নেয় সরকার। ৯০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের এ প্রকল্প ওই বছরের জুলাইয়ে শুরু হয়ে আগামি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। তবে এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি সামান্যই। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চার বছরে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ২২ শতাংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন ধীরগতিতে হতাশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সচিব ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি মো. আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে ‘শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন (কম্পোনেন্ট-২: দেশের আটটি বিভাগে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক ও ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ)’ শীর্ষক এ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, আগামী জুনের মধ্যে এ প্রকল্প কোনোভাবেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়ে প্রকল্প সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি। এতে প্রকল্পটির ব্যয়ও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চার বছরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. হেলাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, এ প্রকল্পে যুক্ত জাপানিরা হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনার পর বাংলাদেশে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই প্রকল্পটির কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। এছাড়া বিভাগীয় মেডিকেল কলেজের পাশে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় জায়গা পেতেও সমস্যা হয়েছে। আর কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এখন নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়েই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতির হার বেশ কম। এছাড়া উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পে দাতাদের অনেক বিষয় থাকে, যেগুলো তাদের সম্মতি নিয়ে করতে হয়। এজন্যও বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটছে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর ফলে ব্যয় বাড়বে কিনা এমন প্রশ্নে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এটি দরপত্র প্রক্রিয়ায় চলে গেছে। এক্ষেত্রে ব্যয় অবশ্যই বাড়তে পারে। তবে কী পরিমাণ ব্যয় বাড়বে, তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না।’

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. ফরিদ হোসেন মিঞা বলেন, ‘এ প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এত কম কেন বলতে পারব না। আমরা যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে নির্দেশনা দিয়ে থাকি। তবে বিভিন্ন কারণে অনেক সময় তা হয়তো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।’ 

প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে, সভা চলাকালে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) জানান, আলোচ্য প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রকল্প সাহায্য বাবদ অর্থায়নের পরিমাণ ৭০৩ কোটি ২ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৭৮ শতাংশ। 

প্রকল্পটির উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে—দেশের আটটি বিভাগের বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ; রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি; দেশের আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক টেকনোলজি স্থাপন এবং ক্লিনিক্যাল শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা। 

অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ওই সময় আরো জানান, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মোট ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় ২০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা; যার 

মধ্যে প্রকল্প সাহায্যের পরিমাণ ১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত জুন পর্যন্ত চার বছরে মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের কেবল ২ দশমিক ২২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। 

এরপর প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতিসহ বাস্তবায়নে সমস্যার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের পক্ষে উপ-প্রকল্প পরিচালক সভাকে জানান, প্রকল্প শুরুর অনুমোদিত সময় ২০১৬ সালের জুলাই হলেও প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত সময়ের ১৮ মাস পর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মূলত হলি আর্টিজানের ঘটনার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে বিলম্ব ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিভাগ থেকে ময়মনসিংহ বিভাগ পৃথক হওয়ার ফলে প্রকল্পের পুনর্গঠিত ডিপিপিতে নবসৃষ্ট ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য কার্যক্রমের সংস্থান করে প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন গ্রহণে সময় প্রয়োজন হয়। 

তিনি আরো জানান, জাইকার অর্থায়নে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও খুলনা বিভাগে সাতটি ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ভবন এবং জিওবি অর্থায়নে ময়মনসিংহে একটি ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ভবন নির্মাণ করা হবে। এ পর্যন্ত কনসাল্টিং সার্ভিস ফার্ম নিয়োগসহ ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ভবনের জন্য স্থান নির্বাচন; জাইকা অর্থায়নে স্থাপিতব্য সাতটি ইমেজিং ভবনের স্থান প্রতিটি হাসপাতালের ম্যাপে অন্তর্ভুক্তকরণ, সাইটের টপোগ্রাফিক সার্ভে ও সয়েল টেস্ট সম্পন্নকরণ, চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন ও ব্যয় প্রাক্কলন সম্পন্ন করে জাইকার অনুমোদন গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। 

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে জিওবি অর্থায়নে ইমেজিং ভবন স্থাপনের জন্য স্থান নির্ধারণ করে ম্যাপে অন্তর্ভুক্তকরণ ও চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। এজন্য দ্রুত দরপত্র আহ্বান করা হবে বলেও জানান উপ-প্রকল্প পরিচালক।

প্রকল্প পরিচালক সভাকে অবহিত করেন, কভিড-১৯-এর কারণে বাংলাদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নিয়োগকৃত কনসাল্টিং ফার্মের জাপানি পরামর্শকরা বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এসে দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তবে প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিলম্ব না ঘটার জন্য তারা আন্তর্জাতিক পরামর্শকের পরিবর্তে স্থানীয় পরামর্শক হিসেবে নির্মাণকাজের দরপত্রগুলো জাপানে অবস্থান করেই রিমোট টেন্ডার অ্যাসিস্ট্যান্সের মাধ্যমে সম্পন্ন করার প্রস্তাব করেছেন। তাদের হোম অফিস রেট (স্থানীয়) ও ফিল্ড রেট (আন্তর্জাতিক) পারিশ্রমিক সমান হওয়ায় অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না। 

এভাবে দরপত্র মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে জাইকা কর্তৃক অনাপত্তি প্রদান করা হয়েছে। রিমোট টেন্ডার অ্যাসিস্ট্যান্সের মাধ্যমে দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনাপত্তি প্রয়োজন। এরপর সভায় রিমোট টেন্ডার অ্যাসিস্ট্যান্সের মাধ্যমে দরপত্র মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়।

সভায় আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হাসপাতাল চত্বরের বাইরে কোনো ইমেজিং ভবন নির্মাণ করা যাবে না। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০২১ সালের জুন থেকে বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করে প্রকল্প সংশোধন প্রস্তাব দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রকল্প সংশোধনকালে নির্মিতব্য ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ভবনের দুটি ফ্লোরে অর্থাৎ ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ল্যাবরেটরি ও প্যাথলজি পরীক্ষার সুবিধা সৃষ্টির সংস্থান রাখতে হবে। 

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ডা. ফয়জুল হাকিম বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, এ ঘটনা থেকে সেটাই প্রমাণিত হয়। এসব ক্ষেত্রে কমিশন আছে, বাজেট বাড়িয়ে আরো চুরি করার সুযোগ রয়েছে। তাই বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িতরা ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবায়নে দেরি করে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে কোনো তদারকি নেই। সময় বাড়িয়ে কমিশন বাড়ানোর জন্যই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি করা হয়।’