একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর শুরু হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এর পরই ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর পালা। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে নানা রঙের ফুলে সুবাসিত হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদি। তাই চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। কভিড-১৯-পরবর্তী এবারই প্রথম সশরীরে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই পুরো এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সপ্তাহখানেক আগে থেকেই তত্পর রয়েছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। পুরো এলাকা ঢেকে ফেলা হয়েছে নিরাপত্তার চাদরে। বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। চলছে গোয়েন্দা নজরদারিও।

সরজমিনে গতকাল বিকালে দেখা যায়, শহীদ বেদিতে আঁকা হচ্ছে আলপনা। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে চারুকর্ম, বর্ণমালার অক্ষরে স্পষ্ট হচ্ছে মাতৃভাষার মর্ম। ব্যস্ত সময় পার করছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাও। সবার হূদয়েই শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধানুভূতি।

এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে সবার সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষ। অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা নিয়ে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল, অমর একুশে উদ্যাপন কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূইয়া, যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক মো. লুত্ফর রহমান ও অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা এবং ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী।

উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান জানান, রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী, একুশের প্রথম প্রহরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিমূল প্রস্তুতের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং যথাসময়েই তা সম্পন্ন হবে। একুশের প্রথম প্রহরে সর্বপ্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রীরা, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা। পর্যায়ক্রমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন তিন বাহিনীর প্রধানরা, ভাষাসৈনিক, ঢাবি উপাচার্য, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্যরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, অনুষদের ডিন ও হলের প্রাধ্যক্ষরা। পরবর্তী সময়ে সর্বস্তরের জনসাধারণের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের জন্য শহীদ মিনার উন্মুক্ত করা হবে।

সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে দিবসটি পালনের লক্ষ্যে আজিমপুর কবরস্থান ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাতায়াতের জন্য একটি রুট-ম্যাপ প্রণয়ন করেছে একুশে উদযাপন কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি, যা আজ সন্ধ্যা ৭টা থেকেই কার্যকর হবে। রুট-ম্যাপ অনুযায়ী, সর্বস্তরের জনসাধারণ পুরনো হাইকোর্টের সামনের রাস্তা দিয়ে দোয়েল ক্রসিং, বাংলা একাডেমি, টিএসসি মোড়, উপাচার্য ভবনের পাশ দিয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড়, নিউমার্কেট-ক্রসিং পার হয়ে আজিমপুর কবরস্থানের উত্তর দিকের গেট দিয়ে কবরস্থানে প্রবেশ করা যাবে এবং শহীদদের কবর জিয়ারতের পর আজিমপুর কবরস্থানের মূল গেট দিয়ে বের হয়ে আজিমপুর সড়ক হয়ে পলাশী মোড় থেকে সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের সামনে দিয়ে যেতে হবে শহীদ মিনারে।

কবরস্থানে না গিয়ে বিকল্প পথে শহীদ মিনারে যেতে চাইলে উপাচার্য ভবন পার হয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড় থেকে বাম দিকের রাস্তা দিয়ে সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা হয়ে যাওয়া যাবে। নিউমার্কেট ক্রসিং থেকে ইডেন কলেজের সামনের রাস্তা দিয়েও আজিমপুর মোড়, পলাশী মোড় হয়ে সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা হয়ে শহীদ মিনারে যাওয়া যাবে। চানখাঁরপুল এলাকা থেকে বকশীবাজার মোড় হয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের রাস্তা দিয়েও পলাশী মোড় হয়ে যাওয়া যাবে শহীদ মিনারে।

টিএসসি মোড় থেকে শহীদ মিনার ও মেডিকেল কলেজে যাওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। উপাচার্য ভবন গেট থেকে ফুলার রোড হয়ে ফুলার রোড মোড় পর্যন্ত রাস্তা এবং চানখাঁরপুল থেকে কার্জন হল পর্যন্ত রাস্তা জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের পর সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের সামনের রাস্তা দিয়ে দোয়েল চত্বর ও পেছনের রাস্তা দিয়ে চানখাঁরপুল হয়ে শুধু প্রস্থান করতে হবে, শহীদ মিনারের দিকে যাওয়া যাবে না।

এদিকে শহীদ মিনারে সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় তুলে ধরতে গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। সেখানে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘তিন ভাগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সোমবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ও সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন অর্থাৎ বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কাজ করবে নিরাপত্তা বাহিনী। আমরা নিরাপত্তার জন্য পলাশী থেকে শুরু করে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সমস্ত এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে এসেছি। পুলিশের কন্ট্রোল রুম থেকে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরা দিয়ে নজরদারিতে রাখা হবে। আর্চওয়ে থাকবে, সেটা দিয়ে শহীদ মিনারে আসা মানুষকে সার্চ করা হবে। কোনো ব্যাগ কিংবা জিনিস নিয়ে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হবে না।’

ডিএমপি কমিশনার আরো বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী উন্মুক্ত পরিবেশে এবার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারে আসবেন। রাজধানীর সর্বস্তরের মানুষ শহীদ মিনারে আসবে। তাই নিরাপত্তার জন্য আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আমাদের সহযোগিতা করছে।’