রাজধানীর ব্যস্ততম প্রবেশদ্বারগুলোর একটি বিমানবন্দর মোড়। এ স্থানটিকে ঘিরে দুটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং একটি করে পাতাল মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব ও আন্ডারপাস নির্মাণের কাজ চলমান ও পরিকল্পনাধীন। তবে বাস্তবায়নাধীন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে মোড়টিকে ঘিরে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। এর মধ্যে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বাংলাদেশ রেলওয়ে ও ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লিমিটেড। বিরোধপূর্ণ জমির পরিমাণ প্রায় ৭৮ একর। চলমান বিরোধের কারণে ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ এবং বিআরটি প্রকল্পের একটি বাস টার্মিনাল নির্মাণকাজ বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ করছে রেলওয়ে ও ঢাকা বিআরটি কোম্পানি। জমি নিয়ে জটিলতার কারণে ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে।

খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, ১৮৮২ সালে বিমানবন্দর এলাকায় রেলওয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ষাটের দশকে দেশের প্রধান বিমানবন্দরটি ঢাকার তেজগাঁও থেকে কুর্মিটোলায় সরানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় বিমানবন্দর করার জন্য রেলওয়ে তত্কালীন বিমানবন্দর উন্নয়ন সংস্থাকে প্রায় ৫০ একর জমি হস্তান্তর করে। বিপরীতে বিমানবন্দর উন্নয়ন সংস্থা কিছু জমি অধিগ্রহণ করে রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে জমি হস্তান্তর করা হলেও সেই প্রক্রিয়ার কোনো নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে এসব জমির বেশির ভাগই রেকর্ড করা হয়েছে বেবিচকের নামে। এর মধ্যে বিরোধপূর্ণ ৭৮ দশমিক ১৫ একর জমিও রয়েছে।

এ জমির কিছু অংশ ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ও ঢাকা বিআরটি কোম্পানিকে হস্তান্তর করেছে বেবিচক। বিমানবন্দর মোড়ে মেট্রোরেলের একটি পাতাল স্টেশন এবং বিআরটি করিডোরের একটি বাস টার্মিনাল তৈরি করা হবে এ জমিতে। অন্যদিকে বিদ্যমান রেলওয়ে স্টেশনটিকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে উন্নীত করতে প্রায় সাড়ে ১৩ একর জমি প্রয়োজন রেলওয়ের। রেলওয়ের বাস্তবায়নাধীন ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ নির্মাণ এবং টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত নতুন আরেকটি রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পও বিমানবন্দর এলাকার জমি নিয়ে জটিলতায় পড়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়াল গেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ’ প্রকল্পের ওপর অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির তিনটি এলাকায় রাইট অব ওয়ে’তে (আরওডব্লিউ) জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে চারটি মামলা চলমান। বিমানবন্দর এলাকায় ৭৮ দশমিক ১৫৬৪ একর জমির মালিকানা নিয়ে বেবিচকের সঙ্গে রেলওয়ের বিরোধ রয়েছে। এরই মধ্যে বেবিচক এ জমি র্যাব, এমআরটি লাইন-১, বিআরটিসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে হস্তান্তর করেছে। বিমানবন্দর এলাকায় আধুনিক রেলওয়ে স্টেশন ভবন এবং মাল্টিমোডাল হাব বিবেচনা করে ইয়ার্ড চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং ১৩ দশমিক ৪৪৩ একর জমি বাংলাদেশ রেলওয়েকে হস্তান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের গতিপথে থাকা আরো কিছু জমি নিয়ে জটিলতা থাকায় সেগুলো অধিগ্রহণ করতে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা লাগতে পারে বলে কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমানবন্দর মোড়ের জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, যে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে, সেটার প্রকৃত মালিক বাংলাদেশ রেলওয়ে। ব্রিটিশ আমলে এ জমি রেলের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এরপর রেলের জমি বেবিচককে ব্যবহারের জন্য দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব জমি বেবিচকের নামে রেকর্ড হয়ে থাকায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে জমি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে বিমানবন্দর মোড় সংলগ্ন এলাকায় বেবিচকের নামে রেকর্ডভুক্ত থাকা জমি বিআরটির বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যদিও ঢাকা বিআরটি কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, বরাদ্দ পেলেও এ জমিটি ভুলক্রমে বেবিচকের নামেই রেকর্ড করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে জায়গাটি অবৈধভাবে দখলে রেখেছে। রেকর্ড সংশোধনের জন্য গত ১১ আগস্ট এসি ল্যান্ড অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে।

জমি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে চলমান ও পরিকল্পনাধীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ও যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বিমানবন্দরের মতো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশদ্বারে বিক্ষিপ্তভাবে অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখানে অনেকগুলো সংস্থা জড়িত এবং এ সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। যে যেভাবে পারছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এটা করতে গিয়েই তৈরি হয়েছে জটিলতা। ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায় সমন্বয়হীনভাবে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে সেগুলো কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে এখনো সময় আছে। যত দ্রুত সম্ভব সমন্বয় করে এবং পরিকল্পিতভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা করতে পারলে জায়গা-জমিসহ সব ধরনের জটিলতা নিরসন করে কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

বিমানবন্দর মোড় সংলগ্ন জমি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (আরবান ট্রান্সপোর্ট) নীলিমা আখতারকে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে মহাসড়ক বিভাগের সচিবের উপস্থিতিতে কয়েকদিনের মধ্যে একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। আশা করি, সেই সভাতেই বিষয়গুলো সমাধান হবে।