আমন মৌসুমের ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষক। দেশের বিভিন্ন স্থানে খোলাবাজারে এ ধান প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন কৃষক। সরকারিভাবেও আমন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধান ২৮ টাকা ও চাল ৪২ টাকায় কেনা হবে। সে হিসেবে প্রতি মণ ধানের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ১২০ টাকা, যা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়েও কম। সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ধান-চালের এ দর পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এটি বহাল হলে কৃষক স্থানীয় বাজারগুলোতেই ধান বিক্রি করতে বেশি আগ্রহী হবেন। তাছাড়া সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে প্রক্রিয়াগত জটিলতাও রয়েছে। ফলে ধান-চাল ক্রয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বরাবরের মতোই অধরা থেকে যাবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের আমন মৌসুমে সরকারিভাবে তিন লাখ টন আমন ধান ও পাঁচ লাখ টন সেদ্ধ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হবে। ধান কেনা হবে ২৮ টাকায় ও চাল ৪২ টাকায়, গত বছর যা ছিল যথাক্রমে ২৭ ও ৪০ টাকা।
চলতি বছর ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার টন। বিভিন্ন জেলায় আগাম আবাদ করা আমন ধান এরই মধ্যে কাটতে শুরু করেছেন কৃষক। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টরের ফসল কাটা হয়েছে, যা মোট আবাদকৃত জমির ২ দশমিক ৯১ শতাংশ।
এরই মধ্যে নতুন আমন ধান খোলাবাজারে বিক্রি করতে শুরু করেছেন কৃষক। খোলাবাজারে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দাম পাওয়া যায়। আবার সরকারি গুদামে ধান-চাল বিক্রি করতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ধান শুকানোসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়, যা অনেক কৃষকই ঝামেলা মনে করেন। আবার সরকারি গুদাম পর্যন্ত নিজের খরচেই কৃষককে ধান পৌঁছে দিতে হয়, যা বাড়তি খরচ যোগ করে। সব মিলিয়ে সরকারি গুদামের চেয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রি বেশি সাশ্রয়ী বলে কৃষক মনে করছেন।
বাজার ঘুরে দেখা গিয়েছে, নওগাঁর কয়েকটি উপজেলায় আমন মৌসুমের স্বর্ণা-৫ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায়। এছাড়া জেলাটিতে খোলাবাজারে বোরো মৌসুমের প্রতি মণ জিরাশাইল ধান ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৫৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আউশ মৌসুমের ব্রিধান-২১ জাত ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৩০ টাকা, ব্রিধান-৫৬ জাত ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ব্রিধান-৭৫ জাত ১ হাজার ২৩০ থেকে ১ হাজার ২৮০ টাকা ও পারিজা ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পরিবহন খরচ, ধান শুকানোর খরচ, নির্ধারিত মাত্রায় আর্দ্রতা বজায় রাখাসহ নানামুখী ঝামেলায় খোলাবাজারে বিক্রিতে প্রতি মণে অন্তত ১৫০-২০০ টাকা বেঁচে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক।
এক বিঘা জমিতে স্বর্ণা-৫ জাতের ধান আবাদ করেছেন মান্দা উপজেলার বিষ্ণপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিছু ফসল কারেন্ট পোকায় ক্ষতি করেছে। শুরুতে কমপক্ষে ২০ মণ ফলন পাওয়ার আশা ছিল। তবে এখন ১২ মণের মতো ফলন পাওয়া যাবে। এ ধান যদি মাত্র ২৮ টাকা কেজি দরে সরকারি গুদামে সরবরাহ করি তাহলে লাভ তো দূরের কথা লোকসানে পড়তে হবে। কারণ গুদামে ধান দিতে গেলে অনেক হয়রানির মুখে পড়তে হয়। বাড়তি পরিবহন ভাড়া, ধান শুকানো, আর্দ্রতা রক্ষাসহ নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। আবার ধান বিক্রির টাকা পেতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। এত কিছু পার করতে গেলে প্রতি মণ ধান থেকে এমনিতেই ৩-৪ কেজি ওজন কমে যায়। তাই স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করাই আমার কাছে সহজ মনে হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর কয়েক দফায় ডিজেলের দাম বেড়েছে। বেড়েছে সারের দামও। ফলে পরিবহন খরচসহ নানাভাবে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বিঘাপ্রতি এক-দেড় হাজার টাকা বেড়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের বাচাড়ী গ্রামের কৃষক আহসান হাবীব বণিক বার্তাকে বলেন, ১০ বিঘা জমিতে ব্রি-৮৭ জাতের আমন ধান আবাদ করেছি, যেখানে ধান রোপণ থেকে শুরু করে কাটা-মাড়াইয়ে শ্রমিক খরচসহ বিঘাপ্রতি প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ পড়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই এ ধান শুকানো যাবে। খরচের হিসাব করলে এক বছর আগের চেয়ে এবার বিঘাপ্রতি এক-দেড় হাজার টাকা খরচ বেড়েছে। মূলত ডিজেল ও সারের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ দামে উৎপাদিত ধান স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলেই লাভ হবে। কেননা সরকার যেসব শর্ত ও দাম বেঁধে দিয়েছে তা মেনে গুদামে ধান দিলে আমাদের লোকসাই গুনতে হবে। সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের দাম কমপক্ষে ৩৫ টাকা করা উচিত।
যশোরেও আগাম আমন মৌসুমের ধান বিনা-২২, বিনা-১৭সহ কয়েকটি জাত বাজারে আসতে শুরু করেছে, যেগুলো প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ধলোগ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্য বছরের চেয়ে এবার উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে সে দামে কৃষক বিক্রি করবেন বলে মনে হয় না। এখনই বাজারে প্রতি মণ ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যাচ্ছে। সরকারিভাবে দাম কম পাওয়া যায় আবার নানা ঝামেলাও পোহাতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারিভাবে ধানের দাম কম হওয়ায় কোনো বছরই ধান-চাল সংগ্রহের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায় না। সর্বশেষ বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান ২৭ টাকায় ও সেদ্ধ চাল ৪০ টাকায় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এ সময় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার টন। নির্ধারিত সময় শেষে বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭৪ টন। সে হিসেবে লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ ভাগই পূরণ হয়নি। তবে চালের ১১ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার ৮৮ টন।
এ বিষয়ে সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ধান ও চালের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে সরকার একটি মূল্য নির্ধারণ করে। এ বছর ডিজেল ও সারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সে হিসেবে সরকার নির্ধারিত মূল্য কৃষকদের জন্য লাভবান হবে না। আমাদের কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ দেখতে হবে। আবার সরকার দাম বাড়ালে কিন্তু খোলাবাজারে চালের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। তখন ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবু সরকারি মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কৃষক যেন লোকসানে না পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের শঙ্কা রয়েছে। ফলে এ মুহূর্তে কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান তাহলে তারা চাষাবাদ থেকে সরে যেতে পারেন, পেশা পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন। তাই তাদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
বেসরকারি মজুদ বাড়লে একটি মহল বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, মজুদের প্রায় ৬০ শতাংশ থাকে চালকল মালিকদের কাছে। বাকিটা কৃষক ও নব্য ব্যবসায়ীদের কাছে থাকে। চালকল মালিকদের মজুদের নির্দিষ্ট একটি সীমা আছে। সমস্যা হয় সিন্ডিকেট করার ফলে। সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। এ সমস্যা দীর্ঘদিনের হলেও এখন পর্যন্ত সমাধান করা যায় না।
গতকাল সচিবালয়ে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভা শেষে ধান ও চালের দাম নির্ধারণে কৃষকের স্বার্থ দেখা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, তিন-চার বছর ধরে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কোনো ধান কেনা হচ্ছে না। যেমন আমরা অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনি। আবার কৃষকের তালিকা ধরে লটারির মাধ্যমে সংগ্রহ করি। টাকাও সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে চলে যায়। এখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো সুযোগ নেই।
সভায় কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নওগাঁ প্রতিনিধি আরমান হোসেন রুমন ও যশোর প্রতিনিধি আব্দুল কাদের)










