রিলায়েন্স এডিএ গ্রুপের কর্ণধার অনিল আম্বানি। ২০০৮ সালেও ছিলেন ভারতের শীর্ষ তিন ধনীর একজন। ২০১০ সালে বড় ভাই মুকেশ আম্বানির কাছে এক মামলায় হেরে যাওয়ার পর থেকেই পতন শুরু হয় তার। ২০১৬ সালে মুকেশ আম্বানির জিও গ্রাহকদের জন্য প্রথম ছয় মাস সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ভয়েস ও ডাটা সেবা নিয়ে এলে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে অনিলের আরকম, যা তার ব্যবসা আরো খারাপের দিকে নিয়ে যায়। এর পর থেকেই একের পর এক ঋণের জালে জড়িয়ে যেতে থাকেন অনিল। দেনার দায়ে তার সম্পদ একপর্যায়ে শূন্যের কোটায় নেমে আসে। দুর্দশা কাটাতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ব্যবসার মাধ্যমেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।

ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদক হলেও চার বছর ধরেই ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে রিলায়েন্স পাওয়ারের। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে ৬৪ কোটি ২৬ লাখ রুপি কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছিল রিলায়েন্স পাওয়ারের। পরের বছর মুনাফা কমে মাত্র ২ কোটি ২৫ লাখ রুপিতে দাঁড়ায়। এরপর দুই বছর ধরে লোকসান গুনছে রিলায়েন্স পাওয়ার। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ৬০১ কোটি ৬৬ লাখ ও ২০২০ সালে ৩৮৮ কোটি ৮৪ লাখ রুপি লোকসান হয়েছে কোম্পানিটির। ফলে ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবসা থেকে দেনা শোধ করা সম্ভব হচ্ছে না অনিল আম্বানির পক্ষে। অন্যদিকে সরকারের নীতিসহায়তার কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসা বেশ লাভজনক। তাই এখানে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা নিশ্চিত করতে চায় রিলায়েন্স। বলা যায়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবসাকে ঘিরে বড় আশা দেখছেন অনিল আম্বানি।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ব্যবসা নিয়ে অনিল আম্বানির বড় প্রত্যাশা প্রকাশ পায় চলতি বছরের জুনে রিলায়েন্স পাওয়ারের বার্ষিক সাধারণ সভায়ও (এজিএম)। এ সময় কোম্পানির ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে শেয়ারহোল্ডারদের আশার কথা শোনাতে গিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন রিলায়েন্সের বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা উল্লেখ করেন অনিল আম্বানি। শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশে তিনি বলেন,  বাংলাদেশে জাপান এনার্জি ফর নিউ এরার (জেরা) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন ৭৫০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ধাপের উন্নয়ন কার্যক্রম সঠিক পথেই রয়েছে। রিলায়েন্সের মালিকানাধীন সামলাকোট পাওয়ার এ বছরের ১১ মার্চ সরঞ্জামাদি বিক্রির জন্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে চুক্তি করেছে। এতে সামলাকোটের ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার দেনার দায় কমবে বলেও জানান এ ব্যবসায়ী।

শেয়ারহোল্ডারদের সামনে গ্যাসভিত্তিক ৩ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের বিষয়টিও উল্লেখ করতে ভোলেননি অনিল আম্বানি। তিনি জানান, কোম্পানি বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে নির্মাণ ও ক্রয় চুক্তি করে রিলায়েন্স। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য জাপানি কোম্পানি জেরাকে অংশীদার হিসেবে যুক্ত করেন অনিল। ২০১৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর জেরার কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৪৯ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করেছে রিলায়েন্স। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বেশকিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও চুক্তি করেছে রিলায়েন্স। এক্ষেত্রে সব মিলিয়ে এ প্রকল্পে ৬৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণ দেবে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ২০ কোটি ডলার দেবে এডিবি।

রিলায়েন্সের মেঘনাঘাট ৭৫০ মেগাওয়াট আইপিপি-২ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন বিপিডিবির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রবীন্দ্র নাথ সরকার। প্রকল্পটির অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে কেন্দ্রটির নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কভিডের কারণে এটি ২০২৩ সালে পিছিয়ে গেছে।

ধীরুভাই আম্বানি মারা যাওয়ার পর দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব চরমে উঠলে ২০০৫ সালে রিলায়েন্সের সম্পদ ভাগ হয়ে যায়। অনিল আম্বানির ভাগে পড়ে টেলিকম, অবকাঠামো ও আর্থিক সেবা খাতের ব্যবসার দায়িত্ব। পিতা ধীরুভাই আম্বানির মতো অনিলও ব্যাংকের অর্থায়নে মেগা প্রকল্প স্থাপনের বিষয়ে বেশ উচ্চাভিলাষী ছিলেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি বেশ তাড়াহুড়ো করেছেন। ২০০৬-০৮ সালের মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর দরপত্র নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন অনিল। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক দাদরি বিদ্যুৎ প্রকল্প, ভারতজুড়ে সড়ক প্রকল্প, মেট্রো রেল ও কয়লাভিত্তিক বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। তাছাড়া স্টিফেন স্পিলবার্গের কোম্পানি ড্রিমওয়ার্কস কেনার মাধ্যমে বিনোদন জগতেও বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। তবে ২০১০ সালে বড় ভাই মুকেশ আম্বানির কাছে সুপ্রিম কোর্টে এক মামলায় হেরে যাওয়ার পরই অনিল আম্বানির পতন শুরু হয়। ২০১৬ সালে মুকেশের জিওর কাছে প্রতিযোগিতায় ব্যাপক মার খায় অনিলের আরকম। এতে তার ব্যবসায় পতন আরো ত্বরান্বিত হয়। এর পর থেকেই একের পর এক ঋণের জালে জড়িয়ে যেতে থাকেন অনিল। গত বছর অনিল আম্বানির বিরুদ্ধে ভারতে ঋণের অর্থ ফেরত না দেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। সুপ্রিম কোর্ট সে সময় বলেছিলেন, রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস যদি এরিকসন এবির ভারতীয় শাখাকে অবিলম্বে ৫৫০ কোটি রুপি পরিশোধ না করে, তাহলে অনিলকে জেলে পাঠানো হবে। এ সময় তার বড় ভাই মুকেশ আম্বানি ঋণের টাকা শোধ করে সে যাত্রায় তাকে বাঁচিয়ে দেন।