দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে থাকা সিলেট নগরীর ধোপাদীঘি এবার নান্দনিক রূপে ফিরছে। দীঘির তত্ত্বাবধানে থাকা সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) দীঘিটি রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধন করে সাধারণের জন্য খুলে দিচ্ছে। আগামীকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. একে আব্দুল মোমেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী ও সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে ধোপাদীঘি ওয়াকওয়ে প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। এ প্রকল্পের অর্থায়ন করেছে ভারত সরকার।

দীঘির শহর হিসেবে পরিচিতি ছিল সিলেটের। মজুমদারদীঘি, দস্তিদারবাড়ী দীঘি, রামেরদীঘি, লালদীঘি, ধোপাদীঘি, মাছুদীঘি, কাষ্টঘরদীঘি, সুপানিঘাটদীঘি, কাজলশাহদীঘি, সাগরদীঘি, চারাদীঘিসহ অসংখ্য দীঘি ছিল নগরীজুড়ে। এসব দীঘির বেশির ভাগই দখল করে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। যেগুলো বেঁচে আছে সেগুলোও রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। তেমনি একটি ধোপাদীঘি। সেই নাম অনুসারে নগরীর একটি এলাকারই নামকরণ হয়েছে ধোপাদীঘির পাড়। সিলেটের ধোপাদীঘিই একসময় পড়েছিল অস্তিত্ব সংকটে। শিশু পার্ক, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি আর মাইক্রোবাসের স্ট্যান্ডের নামে বেশকিছু জায়গা চলে যায় বেদখলে। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেগুলো উদ্ধার করে ধোপাদীঘিকে নতুন রূপ দেয়ার ঘোষণা দেয় সিসিক। ভারত সরকার এগিয়ে আসে এর অর্থায়নে। ‘ধোপাদীঘি এরিয়া ফর বেটার এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড বিউটিফিকেশন’ নামে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ডালি কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

সিসিক জানায়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ধোপাদীঘিতে সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। দীঘির চারদিকে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বসার জন্য রয়েছে বেঞ্চ। পুকুরে নামার জন্য রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ঘাট। পুকুরের নোংরা পানিকে পরিষ্কার করা হবে। বৃক্ষপ্রেমীদের পরামর্শে সুদৃশ্যভাবে লাগানো হবে সবুজ বৃক্ষ। রয়েছে একাধিক টয়লেট। এসব টয়লেট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে আলাদা পাইপলাইন। পুকুরের পানির সঙ্গে পাইপলাইনের সংযোগ নেই। সবার জন্য উন্মুক্ত এ জায়গাটির প্রবেশপথ থাকবে সিটি করপোরেশনের মসজিদের উত্তর পাশ দিয়ে। মহানগরবাসী সকাল-বিকাল ও সন্ধ্যায় যাতে এখানে এসে হাঁটতে পারেন সেজন্য সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাতের বেলা আলোকসজ্জাসহ সংশ্লিষ্ট সব সুবিধা রয়েছে দীঘির চারদিকের ওয়াকওয়েতে।

অন্যদিকে দীঘির সৌন্দর্যবর্ধন কাজ শুরুর পর পরিবেশবাদীরা নানা অভিযোগ তোলেন। প্রকল্পের পরিকল্পনায় পুকুরের মধ্যখানে একটি রেস্তোরাঁ করার খবর চাউর ছিল। তবে সিটি করপোরেশন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। আপাতত ওয়াকওয়ে আর মাঝে মাঝে বসার জায়গা ছাড়া তেমন কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, এ দীঘিটি ছিল অব্যবহূত। তাই দীঘিটির অস্তিত্ব রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধন করে যেন শহরের মানুষের উপকারে আসে সেজন্য সিটি করপোরেশন এ প্রকল্প হাতে নেয়। পরিবেশ ধ্বংস করা বা দীঘিকে ক্ষতি করা কখনো উদ্দেশ্য ছিল না। দীঘির মধ্যখানে রেস্তোরাঁ করা বা কোনো অবকাঠামো করার পরিকল্পনা সিসিকের নেই।

সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদুল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, মূল দীঘির আয়তন সংকুচিত করে ইট-পাথর-সিমেন্টের ওয়াকওয়ে দৃষ্টিনন্দন হতে পারে; তবে প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ অনুকূল নয়। আমাদের দাবি, ধোপাদীঘিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত শিশু পার্ক অপসারণ করতে হবে। তিনি বলেন, কোনো অবস্থায় যেন সেখানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠে; সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। দীঘির পাড় যাতে পরিবেশবান্ধব থাকে; সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে।

সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ধোপাদীঘি রক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেই মূলত সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। দীঘি খনন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, পাড় বাঁধানো ও ঘাট তৈরি করা ছিল এ প্রকল্পের মূল কাজ। সেই কাজটিই করা হয়েছে।