একটা সময় হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজে বেড়িয়েছেন বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা সুহাদা জামান, কিন্তু কোথাও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত চাকরি। এরপর নেন নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত। যদিও তখন লগ্নি করার মতো টাকা ছিল না তার। অনলাইনে একটা পেজ খুলে প্রথমে নিজের রান্না খাবার বিক্রি শুরু করেন। মজাদার সব খাবারে ক্রেতারা আকৃষ্টও হন। বিভিন্নভাবে বাধা এলেও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

বগুড়া শহরের কালীতলা এলাকার আলোর মেলা স্কুল লেনে সুহাদা জামানের বাড়ি। বাবা আইনজীবী গহরুজ্জামান মাহবুব। মা গৃহিণী শাহনাজ বেগম। একমাত্র ভাই জুনাইদ জামান মাহী কলেজে পড়ছেন। সুহাদা বগুড়া সৈয়দ আহম্মেদ কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স শেষ করেন ২০১৭ সালে। অনার্সের রেজাল্ট হওয়ার পরপরই তার পরিবার ধীরে ধীরে বিভিন্ন সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে।

আইনজীবী বাবাও হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবার পরিচালনা, বাবার চিকিৎসা খরচ, ছোট ভাইয়ের লেখাপড়া, নিজের লেখাপড়া—সব মিলিয়ে মাথায় যেন পাহাড়সম চাপ তার। বিভিন্ন স্থানে চাকরি খুঁজেও পাননি। প্রথম দিকে তেমন পুঁজি না থাকায় অনলাইনে একটা পেজ খুলে রিসেলার (অন্যের পণ্য বিক্রি করা) হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু কভিডের কারণে শুরুতে কিছুটা ধাক্কা খান সুহাদা জামান। তবে ব্যবসা বন্ধ না রেখে কিছু কিছু অর্ডার নিয়ে বিক্রি করতে থাকেন। রিসেলার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বেশ অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন। এরপর নিজের পণ্য তৈরি ও বিপণনের চিন্তা আসে মাথায়। অনলাইন দেখে কিছু প্রশিক্ষণ নেন। আর কিছু বিষয় তিনি নিজেই রপ্ত করেন। প্রথমে নিজের রান্না করা খাবার অনলাইনে হোম ডেলিভারি শুরু করেন। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ছোট ভাইয়ের রঙ নিয়ে ইচ্ছামতো পেইন্ট শুরু করেন। এরপর সেগুলো বিক্রির জন্য অনলাইনে দেন। তাতেও ধীরে ধীরে সাড়া পেতে থাকেন। পরে কাপড়ে হ্যান্ড পেইন্টিং শুরু করেন। এর সঙ্গে ধীরে ধীরে অনলাইন, অফলাইনে প্রশিক্ষণ নেন।

প্রথমদিকে খাবার হিসেবে শুধু চিকেন বান নিয়ে কাজ শুরু করেন সুহাদা জামান। খুব কম সময়ে খাবারটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে চিকেন বানটি শহরের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে বিক্রি হতে থাকে। হোমমেড খাবার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বগুড়া শহরে তার নাম ছড়িয়ে গেল। দেশী-বিদেশী খাবার, কেক, আচার, পিঠা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে খেজুরের লাড্ডু, যার নাম দিয়েছেন ক্যান্ডিবাইট। এটিই তার সিগনেচার পণ্য। ক্যান্ডিবাইট দ্রুত ভোক্তার নজরে পড়ে। চিনি ছাড়া তৈরি ক্যান্ডিবাইট ছোট-বড় সব বয়সী মানুষ খেতে পারে বলে জানান সুহাদা জামান।

উদ্যাক্তা সুহাদা জামান বলেন, ‘নিজে উদ্যাক্তা হব সেটা কখনো ভাবিনি। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ধার করা টাকায় শুরু হয় আমার পথচলা। বিভিন্নভাবে বাধা-বিপত্তি পার হতে হয়েছে। তবে এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম যেন মেয়েদের সাহায্য করতে পারি। একদিকে বাবা অসুস্থ। আবার উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বাবার বাধা, সব মিলিয়ে চাপ ছিল। তার পরও নিজেকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। প্রথম দিকে না পেলেও কিছুদিন পর পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছি। কিছুটা সফল হলে পরে অবশ্য বাবাও উৎসাহ দিয়েছেন। এখন পরিবারের পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যাক্তাও আমাকে সহযোগিতা করছেন।’


নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নিজের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো, মেয়েদের ট্রেনিং করানো এবং পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করা। আমার অনলাইন পেইজের নাম শখ-শৌখিন, যেখানে সব ধরনের পেইন্টিংয়ে জিনিস এবং মাটির তৈরি গহনা বিক্রি হয়। হোমমেড খাবারের জন্য এখন অনেক ক্রেতা বা ভোক্তা নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। তবে উদ্যোক্তা হিসাবে সফল কিনা জানি না, তবে নিজের আয় নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।’