অবিভক্ত বাংলায় সরকারি উদ্যোগে যেসব উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার মধ্যে একটি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম উচ্চ বিদ্যালয়টি নব্বইয়ের দশক পর্যন্তও ছিল অভিভাবকদের পছন্দের শীর্ষে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, বুদ্ধদেব বসু, সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক কবির চৌধুরীসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে সময়ের পরিক্রমায় অবস্থানগত কারণে এখন সেই ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, যাতায়াতে সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে সন্তানদের পড়াতে আগ্রহী হচ্ছেন না অভিভাবকরা। এছাড়া শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটও বিদ্যালয়টির ঐতিহ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা। গতকাল সরজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও দেয়ালের একটি বড় অংশ ঢাকা পড়েছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনে। প্রধান ফটকের বাইরে বিভিন্ন যানবাহন ও পথচারীদের তীব্র ভিড়। ভিড়ের মধ্যে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা চলাচল করছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে পাঁচতলা ও তিনতলা দুটি ভবনে। এ ভবনগুলোয় শ্রেণীকক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও নেই সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ। 

জায়গা সংকটের কারণে লাইব্রেরির ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো দুইতলাবিশিষ্ট একটি ভবনে। তবে ভবনটি বর্তমানে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার বইসমৃদ্ধ লাইব্রেরিটিতে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। সরজমিনে দেখা যায়, লাইব্রেরিটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। দরজায় জমেছে ধুলার আস্তরণ। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও খোলা জায়গাও নেই। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিকে খেলার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছে শিক্ষার্থীরা। 

প্রধান শিক্ষক মো. আরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌একসময় এখানে সমগ্র ঢাকা থেকেই শিক্ষার্থী আসত। কিন্তু এখন সড়কের অবস্থা এমন হয়েছে যে কেউ আসতে চায় না। পুরান ঢাকার উচ্চবিত্তদেরও অধিকাংশই এখন নতুন ঢাকায় চলে গেছে। তাদের সন্তানরা সেখানেই পড়ছে। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বেড়েছে। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে অবস্থান ধরে রাখে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতিষ্ঠানে কক্ষ সংকটের কারণে সহশিক্ষা কার্যক্রম ভালোভাবে পরিচালনা করা যায়নি। সংকট মোকাবেলায় এরই মধ্যে পুরনো ভবনটির জায়গায় একটি ছয়তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভবনটি নির্মাণ হলে সংকট দূর হবে। এছাড়া ১৮ জন শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এ সংকটগুলো দূর হলে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে বিদ্যালয়টি বর্তমানের তুলনায় ভালো হবে।’ 

শিক্ষার মানেও আগের অবস্থানে নেই বিদ্যালয়টি। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম নিয়ে গঠিত প্রেসিডেন্সি বেঙ্গলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৮৮৮-৯৬ সালে নয়বারের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আটবার প্রথম হয়েছিল ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। ওই সময় প্রধান শিক্ষক ছিলেন রত্নমণি গুপ্ত। এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও আগের সেই অবস্থান নেই।

বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, ফলাফলে স্কুলটি এখনো পুরান ঢাকার মধ্যে প্রথম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী বিভিন্ন নামি বেসরকারি স্কুল বা ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থাসম্পন্ন এলাকার স্কুলে চলে যাচ্ছে। তাই পুরো ঢাকা শহর বিবেচনা করলে প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। 

আলো আক্তার নামের একজন অভিভাবক বলেন, ‘‌এখানে একটি বড় সমস্যা রাস্তা। স্কুলের গেট থেকে বের হলে পুরোটা পথই সন্তানদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সন্তানকে একা ছাড়তে ভয় হয়।’ একই রকমের কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। মুরগিটোলা এলাকার বাসিন্দা মইনুল ইসলাম তার দুই ছেলেকে ভর্তি করিয়েছেন মতিঝিলের একটি বিদ্যালয়ে। একজন অষ্টম, আরেকজন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। তিনি বলেন, ‘‌ঢাকা কলেজিয়েট আমার বাসা থেকে কাছে হলেও যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো নয়। এর তুলনায় মতিঝিলের বিদ্যালয়টি একটিু দূরে হলেও সেখানে যাতায়াত সহজ। ফলে সেখানেই ভর্তি করিয়েছি।’ 

শিক্ষক সংকটের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক উইংয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজ উদ্দিন বলেন, ‘কিছুদিন আগে দুই বিসিএসের নন-ক্যাডারদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ফলে তারা যোগদান করলে সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষক সংকট অনেকাংশেই কেটে যাবে।’ 

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের বিষয়ে ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘বিদ্যালয়টির‌ অবস্থানগত সমস্যা একটি বড় বিষয়। এ সমস্যা দূর করতে প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ণ। ক্যাম্পাসের চারপাশে যানবাহনের ভিড়সহ নানা সমস্যা রয়েছে। এগুলো আমরা সংশ্লিষ্টদের জানাব। বিদ্যালয়টির পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগ হয় নন-ক্যাডার থেকে। এ কারণে বিষয়টি সময়সাপেক্ষ।’ 

এডুকেশন ওয়াচের চেয়ারপারসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইকোনমিকসের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘‌সময়ের সঙ্গে মানুষের পছন্দে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল বর্তমানে যে অবস্থানে আছে, সেখানে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং। এর পরও যতটা সম্ভব চেষ্টা করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার মান। মান ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে।’