বাংলাদেশকে বলা হয় ‘ল্যান্ড অব এনজিও’। বেসরকারি এসব উন্নয়ন সংস্থা সামাজিক উদ্যোগের বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, পরিবার পরিকল্পনা, পরিবেশ এবং নারী ও শিশু কল্যাণসহ অন্যান্য খাতেও রয়েছে নানা কার্যক্রম। দেশের এনজিও খাতের এ বিবর্তন, অর্জন, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার স্টুডিওতে কথা বলেছেন পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদ

১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমেই দেশে এনজিও বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। সময়ের বিবর্তনে এ খাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে এবং কর্মব্যাপ্তি বেড়েছে। আপনি কি আমাদের পাঠকদের উদ্দেশে সামগ্রিকভাবে এনজিও খাত সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেবেন?

সত্যিকার অর্থে এনজিও খাত সম্পর্কে এ পর্যন্ত তেমন কোনো বড় রিভিউ বা স্টাডি হয়নি। এনজিও মানে হলো নন গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন, যা বেসরকারি সংগঠন হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ নিয়ে ভাবতেন এমন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সরকারি পরিধির বাইরে থেকে সরকারকে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এগিয়ে আসে ব্র্যাক। তবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেও বেসরকারি সংগঠনের কর্মকাণ্ড ছিল। বিশেষ করে আমরা যে খাতে কাজ করি—‘স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা’ খাতে ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা এফপিএবির মতো সংগঠনের কর্মকাণ্ড ছিল, যা মূলত স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়েই শুরু হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। তারপর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে নতুন করে কাজ শুরু হয়। কেউ স্বাস্থ্য, কেউ শিক্ষা এমনি করে কেউ সমাজকল্যাণের জন্য কাজ করেছে। পাশাপাশি আরেকটি ক্ষেত্র যুক্ত হয়েছে—সেটা হলো মাইক্রো ক্রেডিট বা ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি। মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে অনেক এনজিও গড়ে উঠেছে।

এ পর্যায়ে আপনার প্রতিষ্ঠান পিএসটিসি (পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার) সম্পর্কে জানতে চাইব। আমি যতটুকু জানি, শুরুতে এটি একটি প্রজেক্ট আকারে ছিল, যার নাম ছিল ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার’। আপনাদের এ যাত্রার শুরু এবং বর্তমান কাজের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে যদি বলেন।

পিএসটিসির পূর্ব নাম ছিল ফ্যামিলি প্ল্যানিং সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (এফপিএসটিসি)। নাম থেকেই বোঝা যায় এর প্রধান ফোকাস ছিল পরিবার পরিকল্পনা। তখনকার সময়ে জনসংখ্যা ইস্যুই ছিল মূল সমস্যা। তৎকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আব্দুস সাত্তার তখন অনুভব করেছিলেন যে জনসংখ্যা সমস্যা মোকাবেলা করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন তিনি তার বন্ধু কমান্ডার আবদুর রউফকে (যিনি পিএসটিসির প্রতিষ্ঠাতা) বললেন, আমরা চাচ্ছি—স্থানীয় পর্যায়ে সরকার ও বেসরকারি সংগঠনের কাজের সমন্বয়ের জন্য এমন একটা সংগঠন করতে যা কো-অর্ডিনেটিং বডি হিসেবে কাজ করবে। এটা ছিল প্রস্তাব। তৎকালীন পিএসটিসি বাংলাদেশ সরকারের একটা প্রকল্প হিসেবেই যাত্রা শুরু করে। উদ্যোগটা ছিল সরকারের, কিন্তু নেতৃত্ব ছিল কমান্ডার রউফের। তার দায়িত্ব ছিল দেশের আনাচে-কানাচে কিছু সংগঠন, কিছু মানুষ খুঁজে বের করা, যারা স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব নিয়ে একজোট হয়ে এগিয়ে আসবে, তাদের সঙ্গে নিয়ে একটা সংগঠন তৈরি করা। এভাবে ১৯৭৮ সালে পিএসটিসির যাত্রা শুরু। কমান্ডার আবদুর রউফ দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে উদ্যমী মানুষদের খুঁজে বের করেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। ফোর্ড ফাউন্ডেশন বা ইউএসএআইডির মতো দাতা সংস্থাগুলো সরকারের মাধ্যমে এ প্রজেক্টে অর্থায়ন করত এবং তৎকালীন এফপিএসটিসি একটি ‘ইন্টারমিডিয়ারি এজেন্সি’ হিসেবে কাজ করত। আমরা স্থানীয় এনজিওগুলোকে ফান্ড দিতাম এবং তাদের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার চেষ্টা করতাম। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত আমরা প্রায় ৮২টি স্থানীয় এনজিও তৈরি করেছি। এখন যারা অনেক বড়, তারা তখন স্থানীয় এনজিও হিসেবে পিএসটিসির আওতাধীন ছিল। সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য এভাবেই এনজিও গড়ে উঠতে শুরু করে।

১৯৯৫ সালে আপনাদের যে ট্রানজিশন বা রূপান্তর হলো, সেটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

১৯৯৫ সালে যখন সরকার দেখল, আমরা একটি দক্ষ ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছি, তখন তারা আমাদের একটি স্বাধীন বা ইনডিপেনডেন্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে কাজ করার পরামর্শ দেয়। আমরা তখন দেশের নিয়ম অনুযায়ী সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো থেকে নিবন্ধন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করি। বর্তমানে আমাদের একটি সুসংগঠিত গঠনতন্ত্র ও গভর্নিং বডি রয়েছে। ওই সময় আমরা আমাদের কাজের ক্ষেত্র বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। নাম থেকে এফ বাদ দেয়া হলো, অর্থাৎ ফ্যামিলি প্ল্যানিং থেকে পপুলেশনে চলে গেলাম। নাম হলো পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার বা পিএসটিসি। আমরা বর্তমানে পাঁচটি থিম্যাটিক এরিয়া বা প্রধান ক্ষেত্রে কাজ করছি। এগুলো হলো জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি (পিএইচএন)—এটি আমাদের সবচেয়ে বড় থিম্যাটিক এরিয়া। তারপর ইয়ুথ অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট ডেভেলপমেন্ট (ওয়াইএডি) বা যুব ও কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করি। তৃতীয় হলো জেন্ডার ও গভর্ন্যান্স (জিএজি)। চতুর্থ হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজন (সিসিএ)। পঞ্চম হলো দক্ষতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (এসইটি)। বর্তমানে জনসংখ্যা সমস্যার মোকাবেলায় বিভিন্ন সেবা দিই এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিই।

বর্তমানে এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কথা হচ্ছে এবং দাতা সংস্থাগুলোর অগ্রাধিকার তালিকা থেকেও আমরা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছি। এনজিও খাত কি এ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? আমরা কি এখনো পুরনো দাতানির্ভর কাঠামোর মধ্যেই আটকে আছি?

হ্যাঁ, আমরা এখনো অনেকাংশেই দাতানির্ভর। কারণ যেকোনো কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয় এবং এনজিওগুলো মৌলিকভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। তবে আমাদের প্রস্তুতি আরো আগে থেকে নেয়া উচিত ছিল। দাতা সংস্থাগুলো সময়ের সঙ্গে তাদের স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল পরিবর্তন করে। যেমন ২০১২ সাল থেকে নেদারল্যান্ডস সরকার শিক্ষা খাতে অর্থায়ন কমিয়ে সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রডাকটিভ হেলথ রাইটস (এসআরএইচআর) ও ওয়াটার, স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন (ওয়াশ) খাতে গুরুত্ব দেয়। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন আসার পর ইউএসএআইডির ফান্ডিং হুট করে কেটে ফেলা হয় বা বন্ধ করে দেয়া হয়, যার ফলে অনেক দক্ষ কর্মী বেকার হয়ে পড়েন। পিএসটিসি টিকে আছে, কারণ আমরা শুরু থেকেই মাল্টিপল বা ডাইভারসিফায়েড ডোনারদের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছি।

প্রস্তুতির যে বিষয়টি বললেন তার উত্তর বলি, আমরা আসলে প্রস্তুত নই, এ প্রস্তুতিটা আরো আগে থেকে করার কথা ছিল। এখানে শুধু এনজিওগুলোকে দোষ দিলে হবে না, এনজিও বা সব কাজের অভিভাবক আসলে সরকার। সরকার যদি এদের নিয়ে একটা পরিকল্পনা করতে পারত তাহলে আমাদের এ কষ্টটা হতো না। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের ফান্ড কাটের প্রভাবে প্রচুর উন্নয়নকর্মী এখন পর্যন্ত বেকার। আমরা সারভাইভ করছি, কারণ আমরা বিকল্প দাতা খোঁজার চেষ্টা করেছি, আমাদের চেষ্টা ছিল দাতা তালিকায় বৈচিত্র্য আনা। এ কৌশল আমাদের প্রথম থেকেই ছিল। দাতাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি বলেই আমরা লক্ষ্যের চেয়ে বেশি কাজ আনতে পেরেছি, সঙ্গে অবশ্যই ফান্ড।

দাতা সংস্থাগুলোর এ অর্থায়ন সংকোচনের প্রভাব মাঠপর্যায়ে কেমন পড়ছে?

এর প্রভাব অনেক গভীর। এর ফলে একদিকে যেমন দক্ষ হিউম্যান রিসোর্স বা পেশাদার কর্মীরা বেকার হয়ে পড়ছেন, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে জরুরি সেবাগুলো ব্যাহত হচ্ছে। যেমন পরিবার পরিকল্পনার জন্য যে কন্ট্রাসেপটিভ বা জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী প্রয়োজন হয়, তার বড় অংশ আসত দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি ও ইউএনএফপিএর মাধ্যমে। দাতা সংস্থাগুলোর অর্থ বন্ধ হয়ে গেলে কন্ট্রাসেপটিভ সেবার মতো সেবাগুলোও তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে ও পড়বে।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে এনজিওগুলো সামাজিক কাজ থেকে সরে এসে ‘করপোরেট মডেল’-এর দিকে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমার মতে, এনজিওগুলোর কিছুটা ইনকাম জেনারেশনকে উৎসাহিত করা উচিত। কারণ আপনি কতদিন দাতা সংস্থার ওপর নির্ভর করবেন? প্রতিষ্ঠানের সেবাগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে নিজস্ব আয়ের উৎস থাকা প্রয়োজন। ব্র্যাক বা অন্যান্য অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এটি করতে পেরেছে। করপোরেট বলতে যদি একটি আধুনিক কর্মপরিবেশ (নিজস্ব ভবন, কম্পিউটার, ওয়াই-ফাই, ডেস্ক) বোঝায়, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক। কারণ ভালো পরিবেশ ছাড়া কর্মীদের কাছ থেকে ভালো আউটপুট পাওয়া সম্ভব নয়। তবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিকল্পিত পদ্ধতিতে এগোনো যাতে নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে সামাজিক সেবাগুলো চলমান রাখা যায়।

বর্তমানে এনজিও খাতের বড় অংশজুড়ে আছে ‘ক্ষুদ্র ঋণ’। এতে কি মূল উন্নয়নের এজেন্ডাগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে?

মাইক্রোক্রেডিট এম্পাওয়ারমেন্ট বা ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। তবে এটি উন্নয়নের মূল লক্ষ্যগুলোকে সংকুচিত করছে কিনা সে বিষয়ে কোনো সরাসরি বিশেষজ্ঞ মতামত দেয়া আমার জন্য কঠিন। ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে আমরা কাজ না করলেও আমাদের একটি দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে যেখানে আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করি। একজন নারী যদি আর্থিকভাবে সচ্ছল হন, তবেই পরিবারে তার সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হয়। যেমন ধরুন পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তিনি কয়টি সন্তান নেবেন বা কখন নেবেন—এ কথাগুলো পরিবার বা স্বামী তখনই শোনেন যখন ওই নারী নিজে উপার্জন করেন। মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রাম অবশ্যই সরাসরি এ ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে।

টিআইবির একটি গবেষণায় অভিযোগ করা হয়েছে যে অনেক এনজিওর বোর্ড মূলত নির্বাহী প্রধানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে কি সুশাসনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?

আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটির সঙ্গে একমত নই। নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আমি টিম লিডার হিসেবে টিমের সদস্যদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল চেইন অব কমান্ড পছন্দ করি। লিডারের দায়িত্ব হলো টিমের নিয়মকানুন বা ডিসিপ্লিন বজায় রাখা। একইভাবে গভর্নিং বডি বা বোর্ডের সঙ্গে ম্যানেজমেন্টের একটি স্বচ্ছ বোঝাপড়া থাকা জরুরি। আমাদের সংগঠনে তিন মাস অন্তর নিয়মিত বোর্ড মিটিং হয় এবং প্রতিটি পলিসি ইস্যু আমি বোর্ডে পেশ করি। কোনো জরুরি প্রয়োজনে যদি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতেও হয়, আমি চেয়ারপারসনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী মিটিংয়ে সেটির ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নিশ্চিত করি। তবে বোর্ড মেম্বারদের প্রাত্যহিক প্রশাসনে হস্তক্ষেপ বা ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট' করা উচিত নয়।

অনেক এনজিওর ক্ষেত্রে পারিবারিক বা উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্বের অভিযোগ ওঠে। এটি কি এনজিওর স্বচ্ছতা বা জন-আস্থার ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে?

বিষয়টি আপেক্ষিক। কেউ যখন একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, তিনি চান তার অবর্তমানেও এর কর্মকাণ্ড সচল থাকুক। যদি পরিবারে যোগ্য ও দক্ষ উত্তরসূরি থাকে, তবে নেতৃত্ব হস্তান্তরে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়, যেমনটি প্রাইভেট সেক্টরে দেখা যায়। মূল বিষয়টি হলো এ রূপান্তরটি পর্যাপ্ত স্বচ্ছ কিনা এবং সাধারণ মানুষকে তা জানানো হচ্ছে কিনা। সংগঠনের লক্ষ্য অর্জনে যদি পরিবারের বাইরে থেকে নেতৃত্ব প্রয়োজন হয়, তবে সেটাই করা উচিত।

এনজিও সেক্টরে জব সিকিউরিটি বা চাকরির অনিশ্চয়তা কি এ খাতের নৈতিকতা বা দক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?

দেখুন, আমি নিজেও একসময় সিভিল সার্ভেন্ট ছিলাম, পরে ইউএন হয়ে এখন এনজিওতে কাজ করছি। এনজিওর চাকরি মূলত প্রজেক্টভিত্তিক। যখন আমরা কাউকে নিয়োগ দিই, শুরুতেই জানিয়ে দিই যে প্রজেক্ট শেষ হলে চাকরিও শেষ হতে পারে। তবে দক্ষতা থাকলে মানুষ এক প্রজেক্ট থেকে অন্য প্রজেক্টে বা উচ্চতর পদে আসীন হতে পারে। যেমন আমাদের এখানে একজন কাউন্সিলর থেকে প্রজেক্ট ম্যানেজার হয়েছেন। সুতরাং নিজেকে বাজারের জন্য যোগ্য করে তোলা কর্মীর ব্যক্তিগত দায়িত্ব।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এনজিও খাতের সংস্কার বা ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? রাষ্ট্র কি এনজিওকে প্রতিযোগী নাকি পরিপূরক হিসেবে দেখছে?

সরকার বা রাষ্ট্রই সবকিছুর অভিভাবক। এনজিও কখনই সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। এনজিওর কাজ হলো সরকারের কাজের পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা রাখা। বর্তমান সরকারকে অনেকেই ‘এনজিও সরকার’ বললেও বাস্তবতা হলো, একবার সরকার গঠিত হলে সেটি সবার সরকার। এনজিওগুলোকে নিয়মের মধ্যে বা রেগুলেশনের মধ্যে চলাই শ্রেয়, একে আমি নিয়ন্ত্রণ বলতে চাই না। তবে এত অল্প সময়ে (১৮ মাস) পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ভাবনার বাস্তবায়ন কঠিন।

পিএসটিসির দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ বা শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা কী ছিল?

একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়। সরকারি দপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বদল হন। আমাদের দায়িত্ব হলো নতুন দায়িত্বরত ব্যক্তিকে আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে পুনরায় অবহিত করা এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখা। যদি আমরা নিয়মিত যোগাযোগ না রাখি, তবে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ তৈরি হতে পারে। আমাদের সফলতার কথা যদি বলি, সারা দেশে আমরা ৮২টি সংস্থা দাঁড় করিয়েছি, এটি একটি বড় অর্জন। আমরা বর্তমানে বছরে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষকে সেবা দিচ্ছি এবং প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশে আমাদের পদচারণা রয়েছে। এছাড়া ৪৭ বছরের মাথায় আমরা ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশনের (আইপিপিএফ) সদস্যপদ লাভ করেছি, যা আমাদের জন্য একটি বড় স্বীকৃতি।

অনেক সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার চেয়ে রিপোর্টে উন্নয়ন বেশি দেখানো হয় বলে অভিযোগ থাকে। এ সংকট উত্তরণে সমাধান কী?

এ রকম কেউ করে বলে আমি মনে করতে চাই না, মনে করিও না। আমাদের ক্ষেত্রে আইপিপিএফ বোর্ড উল্টো পরামর্শ দিয়েছে যেন আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের কাজের প্রচার বাড়াই। আসলে মাঠপর্যায়ের গ্রাহকরাই আমাদের প্রচারক হওয়া উচিত। দুর্নীতি বা ভুল রিপোর্টিং সব সেক্টরেই কমবেশি আছে, যেমন অনেক সময় ওষুধ শিল্পেও অনৈতিকতা দেখা যায়। এর সমাধান হলো কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা। যদি প্রপোজাল তৈরি, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নে স্থানীয় উপকারভোগী মানুষকে যুক্ত করা যায়, তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। যে কাজই করি না কেন, ন্যূনতম মানবিক নীতিবোধ না থাকলে কোনো কাজই শুদ্ধভাবে করতে পারব না।

ভবিষ্যতে এনজিও খাতের স্থায়িত্ব বা নতুন পথচলা কেমন হওয়া উচিত?

এনজিওগুলোকে এখন দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব আয়ের চিন্তা করতে হবে। কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে, কমিউনিটি থেকেই লিডারশিপ তৈরি করতে হবে। এছাড়া 'প্রোগ্রাম্যাটিক সাসটেইনেবিলিটি' নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ দাতা বা এনজিও না থাকলেও যেন কমিউনিটি নিজ থেকে প্রোগ্রামটি চালিয়ে যেতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো অর্থায়ন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অনেক সময় এনজিওকে লোন দিতে চায় না, যদি তাদের মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রাম না থাকে। এ ভাবনা থেকে বের হয়ে আসা উচিত। অথচ আমাদের নিজস্ব সম্পদ বা ট্রানজেকশন প্রোফাইল অনেক শক্তিশালী। এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এনজিওগুলোকে আস্থায় আনা জরুরি।

এনজিও সেক্টরের এ বিবর্তন অনেকটা একটি সুস্থ চারাগাছের মতো। একে সতেজ রাখতে যেমন সঠিক সার (স্বচ্ছতা) প্রয়োজন, তেমনি এর চারপাশের বেড়া (সরকারি রেগুলেশন) এবং রোদও (জন-আস্থা) সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।