ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালক এবং কার্গো জাহাজের বেপরোয়া চলাচল ও যত্রতত্র নোঙর করে রাখায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে মুন্সিগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌপথ। যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পুরনো জরাজীর্ণ এসব লঞ্চের বেশির ভাগেরই ফিটনেস নেই। ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে থাকলেও প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। নৌপথে শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারাও প্রভাবশালী নৌযান মালিকদের কাছে অসহায়। বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই এ পথে চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রীদের।  

বিআইডব্লিউটিএ ও মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরির সুবাদে মুন্সিগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ হাজার মানুষ নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় যাতায়াত করে। সড়কপথে যানজটের ভোগান্তি এড়াতে নদীপথে লঞ্চে মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে রাজধানীতে যাতায়াত করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এ অঞ্চলের মানুষ। 

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, জোড়াতালি দিয়ে বছরের পর বছর চলছে এ রুটে লঞ্চ। এসব লঞ্চে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে যাত্রীরা। তবে স্বল্প দূরত্বের গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে দীর্ঘদিনেও উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

২০২১ সালের ৫ এপ্রিল এসকেএল-৩ নামের একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় সাবিত আল হাসান নামের একটি লঞ্চ ডুবে সলিলসমাধি হয় ৩৬ জনের। বছর না ঘুরতেই ২০২২ সালের ২০ মার্চ আরেকটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে ১০ জনের মৃত্যু হয়। এরপর দুর্ঘটনা এড়াতে এ নৌরুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটএ)। সে সময় নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, নিরাপদ নতুন নৌযান সংযুক্ত করে নৌপথটি পুনরায় সচল করা হবে। কিন্তু কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর পুরনো লঞ্চগুলোকেই চলাচলের জন্য ফের অনুমতি দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথটি পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। 

রাজু মিয়া নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমাকে প্রতিদিনই ব্যবসার কাজে মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে যেতে হয়। সড়কপথে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাওয়াসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো না হওয়ায় ভোগান্তি এড়াতে লঞ্চে করেই কর্মস্থল থেকে যাতায়াত করি। কিন্তু এসব ফিটনেসবিহীন লঞ্চের কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। অধিকাংশ লঞ্চের চালকই অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক। তবে জীবিকার তাগিদে আমাদের বাধ্য হয়েই এ পথে চলাচল করতে হয়।’

তবে লঞ্চ চালক ও মালিকরা বলছেন, অবৈধভাবে নদীতে নোঙর করে রাখা ও বেপরোয়া গতিতে চলাচল করা বিভিন্ন কার্গো জাহাজের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে লঞ্চচালকসহ যাত্রীদের। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়েছে। তারা নদীতে যত্রতত্র নোঙর করে রাখা কার্গো জাহাজের বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।

ফিটনেসবিহীন এসব লঞ্চ মালিকদের পাশাপাশি কার্গো জাহাজের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়ে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মো. আল জুনায়েদ বলেন, ‘‌জরাজীর্ণ এসব ফিটনেসবিহীন লঞ্চের অদক্ষ চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে আমরা বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে এ নৌপথের যাতায়াত ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন না আসায় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যাত্রীদের ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েক গুণ বেশি।’

অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার নারায়ণগঞ্জ জোনের সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল জানান, নতুন লঞ্চ নামানোর আর্থিক সক্ষমতা তাদের নেই। তাই যাত্রীদের কথা চিন্তা করে আগের লঞ্চগুলোই চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের নদী বন্দরের উপপরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) বাবু লাল বৈদ্য জানান, নৌপথ সচল রাখার জন্য পুরনো ১১টি লঞ্চকে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে যাত্রী কম থাকায় ৯টি লঞ্চ চলাচল করছে কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই।

তিনি বলেন, ‘যত্রতত্র কার্গো জাহাজ নোঙর করে রাখার কারণে যাত্রীবাহী লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ছোটখাটো দুর্ঘটনার তথ্যও আমরা পাচ্ছি। তবে এসব জাহাজের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা তাদের ব্যাপারে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারছি না। ওপর মহলের চাপে পড়তে হচ্ছে আমাদের। তবে যতটুকু সম্ভব অভিযোগ পেলেই আমরা আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি। এছাড়া কার্গো জাহাজ মালিকরা যেন সিরিয়াল মেনে জাহাজ নোঙর করেন সেজন্য তাদের নির্দেশনা পাঠানো হবে।’