স্বাধীনতার ৫১ বছর পার হলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি মুরারীপুর গ্রামে। পাঁচ যুগেও জয়পুরহাট সদর উপজেলার আমদই ইউনিয়নের মুরারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন তুলসী গঙ্গা নদীর ঘাটে নির্মাণ করা হয়নি কোনো সেতু। সেতু নির্মাণে কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। ৫২ বছর ধরে এখানকার নদীর অন্য প্রান্তের গ্রামগুলো থেকে ডিঙি নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হয় শিশুদের। ফলে বৃষ্টিবাদলের দিনগুলোয় বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারে না অনেক শিক্ষার্থী। বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ, তদবির আর অনুরোধ করেও কোনো ফল হয়নি বলে অভিযোগ অভিভাবকের।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ১৯৭০ সালে স্থাপিত হয় জয়পুরহাট সদর উপজেলার মুরারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তুলশী গঙ্গা নদীর কোলঘেঁষে পূর্ব তীরে অবস্থিত বিদ্যালয়টি। প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব দিকে আমদই ইউনিয়নের মুরারীপুর, পাইকর, রাংতা, গোপালপুর, ঘোনাপাড়া, সুন্দরপুর, আর পশ্চিম দিকের পুরানাপৈল ইউনিয়নের পাইকপাড়া, গোবিন্দপুর ও গঙ্গা দাশপুরসহ প্রায় ১৫টি গ্রাম থেকে আসে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী।

তুলসী গঙ্গা নদীটি আগে মরা নদী ছিল। এতে ছিল না তেমন স্রোত। ফলে শিক্ষার্থীরা খরা মৌসুমে বাঁশের সাঁকো ও ডিঙি নৌকায় সহজেই পার হতো। কিন্তু নদীটি পুনঃখনন করায় নদীর গভীরতা ও স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। এতে বর্তমানে খরস্রোতা আর নদীর দুই তীর উঁচু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্ষা মৌসুমে ডিঙি নৌকায় পারাপার হচ্ছে।

আমদই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহানুর আলম সাবু ও পুরানাপৈল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম সৈকত বলেন, ১৫টি গ্রামে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের বসবাস। তুলসী গঙ্গা নদীতে সেতু না হওয়ায় সবচেয়ে বেকায়দায় রয়েছে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া রাতে ও জরুরি দুর্যোগের সময় নদী পারাপার কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই এখানে একটি সেতু হলে এ দুটি ইউনিয়নের ১৫ গ্রামের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে। স্বাধীনতার পর এসব গ্রামে জনবসতি গড়ে ওঠে বলে এ জনপ্রতিনিধি জানান।

মুরারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী আনিকা খাতুন জানায়, ছোট একটি ডিঙি নৌকায় স্কুলে আসতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় নৌকা থেকে নদীতে পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। বর্ষার সময় অনেকেই স্কুলে আসতে পারে না।

চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী জেমি, পঞ্চম শ্রেণীর রিয়াদ ও ওমর ফারুকসহ অনেক শিক্ষার্থী জানায়, যারা সাঁতার জানে না, নদী পার হতে তারা খুব ভয়ে থাকে। অনেক সময় নদীতে পড়ে গিয়ে কাপড় ভিজলে আর স্কুলে যাওয়া হয় না।

পাইকপাড়া গ্রামের অভিভাবক রেজুয়ান হোসেন, মেহেদী হাসান, সেলিনা বেগম বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের যখন স্কুলে পাঠাই তখন অনেক দুশ্চিন্তায় থাকি। কারণ তাদের ডিঙি নৌকায় পার হতে হয়।

গোবিন্দপুর গ্রামের ফারজানা আক্তার ও খাদিজা বেগম বলেন, অনেক সময় আমরা নিজেরা গিয়ে নৌকা পার করে বিদ্যালয়ে দিয়ে আসি। সন্তানরা বাড়িতে না আসা পর্যন্ত উত্কণ্ঠায় থাকি। এছাড়া একটি মাত্র নৌকা থাকায় রোদের মধ্যে শিশুদের দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। নদী পার না হলে চার-পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বাধ্য হয়ে নদী পার হতে হয়।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, বর্ষা মৌসুমে শিশুদের বিদ্যালয়ে যেতে খুবই অসুবিধা হয়। এ সময় উপস্থিতি একেবারেই কমে যায়। তিনি বিদ্যালয়সংলগ্ন স্থানে একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানান।

মুরারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রণব চন্দ্র মণ্ডল বলেন, নদী পারাপারের এমন দুর্ভোগ নিয়ে দীর্ঘ ৫২ বছর ভুগছে এ বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। এছাড়া এসব গ্রামের বাসিন্দাকে সব সরকারি বা অন্যান্য দাপ্তরিক কাজে এ ডিঙি নৌকা করে নদী পারাপার হতে হয়। ১৫টি গ্রামের মানুষের ওই একটি ডিঙি নৌকাই ভরসা। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত একটি সেতু নির্মাণে জোর দাবি জানাচ্ছি।

জয়পুরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন বলেন, সদর উপজেলার আমদই ইউনিয়নের অন্তর্গত মুরারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ডিঙি নৌকায় যাতায়াত করছে। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলাম। আশা করি শিগগিরই সেখানে একটি সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করা হবে।