কুষ্টিয়া শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার ছোট্ট গ্রাম মধুপুর। পাশেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। কলার হাট নামে মধুপুর গ্রামটির খ্যাতি এখন দেশজোড়া। কুষ্টিয়া ও পাশের ছয় জেলাকে ঘিরে এ গ্রামেই গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০ বছরের পুরনো দেশের অন্যতম বৃহত্তম কলার হাট। যেখানে প্রতিদিন বেচাকেনা হয় কয়েক কোটি টাকার কলা। এ কলা চলে যায় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।  

কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের ওপরই অবস্থিত মধুপুর কলার হাট। মাসের প্রায় ৩০ দিনই বসে এ হাটটি। প্রতিদিন ভোর থেকেই কলাচাষী ও ব্যাপারীদের হাঁকডাকের মধ্য দিয়ে এ হাটের শুরু। যেখানে কুষ্টিয়াসহ পাশের ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী ও নড়াইল থেকেও কলা বেচাকেনার জন্য আসেন চাষী ও ব্যাপারীরা। প্রতিদিনই ঢাকাসহ দূর অঞ্চল থেকে কলা ক্রেতারা এখানে আসেন। বেচাকেনা শেষে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাকে কলা পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে।  

মধুপুর ছাড়াও ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় রয়েছে পৃথক কলার হাট। চুয়াডাঙ্গা জেলার বদরগঞ্জ কলার হাট কুষ্টিয়ার মধুপুরের হাটের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হলেও ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে হাটটি। ঝিনাইদহের পবহাটি কলার হাটটিও প্রায় ৩০ বছরের পুরনো। মেহেরপুরে পৃথক কোনো কলার হাট নেই। পাইকাররা এ জেলার কলা ক্রয় করে নিয়ে আসেন কুষ্টিয়ার মধুপুরের হাটে। 

কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, কুষ্টিয়া জেলায় চার-পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয়। এছাড়া ঝিনাইদহ জেলায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর, চুয়াডাঙ্গা এক থেকে দেড় হাজার হেক্টর, মেহেরপুরে ১ হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার হেক্টর জমিতে নিয়মিত কলা চাষ হয়। 

এসব জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, উর্বর মাটি ও অনুকূল পরিবেশ থাকায় এ অঞ্চলে কলা চাষ ও ব্যবসা দুই-ই লাভজনক। কলার বাণিজ্য দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আরো বলছেন, কয়েকটি প্রচলিত জাতের কলার বাইরে জেলা ভেদে ভিন্ন ধরনের কলার ফলন দেখা যায়। কুষ্টিয়া জেলায় রয়েছে সবরি, চাঁপা সবরি, সাদা সবরি, জয়েন্ট কলা, চাঁপাকলা। ঝিনাইদহে রয়েছে চাপা, মাল্টা, কাঁচকলা, পিঁড়িকলা। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গায় উৎপাদন হয়ে থাকে চিনিচাঁপা, বগুড়া সবরি, মেহেরসাগর, কাঁঠালি, বাইশছড়ি ও মেহেরপুরে খ্যাতি লাভ করেছে সাগরকলা যাকে বলা হয় মেহেরসাগর। এছাড়া দুধসর, সবরি, চাঁপা, ঠটে, কাঁচকলার চাষ হয় সেখানে। 

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার উজানগ্রাম এলাকার কলাচাষী আনারুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ২০ বছর কলা আবাদ করছেন। প্রতি বছরই তার ২০-২২ বিঘা জমিতে কলা চাষ করেন। সব খরচ বাদে বছরে ৮-১০ লাখ টাকা লাভ হয়।

কুষ্টিয়ার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মাহাবুল আলম ১৫ বছর ধরে কলা চাষ করেন। তিনি জানান, ‘কলা আবাদে পরিশ্রম ও খরচ দুই-ই কম। কালবৈশাখী ঝড় ছাড়া কলা আবাদে ঝুঁকিও কম। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগেও ৬-৮ টাকা হালি দরে কলা বিক্রি করেছি। সেই কলা এখন ১২-১৫ চাকা হালি পাইকারি বিক্রি করছি।’

ঢাকা থেকে কলা কিনতে আসা শাহাদাত হোসেন নামের এক ব্যাপারী বলেন, ‘এখানকার মাটি কলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। সেই সঙ্গে স্বাদেও খুব ভালো। এখানকার কলায় রাসায়নিকের ব্যবহার না হওয়ায় চাহিদাও বেশি। সে কারণেই নিয়মিত এখান থেকে কলা কিনে ঢাকার বিভিন্ন আড়তে নিয়ে বিক্রি করি।’ 

মধুপুর হাটের ইজারাদার কাজী আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘‌দীর্ঘ ৫০ বছর চলে আসছে মধুপুর কলার হাট। এটি পাশের কয়েক জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় হাট। বর্তমানে এ হাট থেকে সরকার বছরে ৭০-৭৫ লাখ টাকা রাজস্ব পায়।’

কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. হায়াত মাহমুদ বলেন, ‘কুষ্টিয়ার কলা অত্যন্ত সুস্বাদু ও নষ্ট কম হয়। সারা দেশেই কুষ্টিয়ার কলার ব্যাপক চাহিদা।আমরা কলাচাষীদের সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।’ 

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বদরগঞ্জে অবস্থিত কলার হাটটির নাম দশমাইল কলার হাট। বাজারটি ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা সড়কের পাশে দশমাইল এলাকায় বসে সপ্তাহে দুদিন। এ হাটে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার কলাচাষীরা কলা নিয়ে আসেন। 

দশমাইল বাজার কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ মিন্টু জানান, কলার হাটটি প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি পুরনো। কুষ্টিয়া ও ঢাকার ক্রেতারা এখানে কলা ক্রয় করেন। এখানকার কলার একটি অংশ সরাসরি ঢাকা চলে যায়। অন্য অংশটি যায় কুষ্টিয়ার মধুপুর কলার হাটে। 

কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আলী আহম্মেদ হাসানুজ্জামান মানিক বলেন, ‘হাটের পরিবেশ ভালো থাকায় কলার হাট এখানে জমে উঠছে। প্রতি হাটে ২০-২৫ ট্রাক কলা কিনে নেন ব্যাপারীরা। প্রতি হাটে বদরগঞ্জ হাটে সপ্তাহে দুদিনে ১ কোটি টাকার বেশি কলা বিক্রি হয়।’ 

চুয়াডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়া গ্রামের কলাচাষী আবু তৈয়ব জানান, তার তিন বিঘা জমিতে সবরি জাতের কলা চাষ করেন। ফলনও ভালো হয়েছে। এরই মধ্যে তিনি ৫০ কাঁদি কলা বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি কাঁদি কলা ৫০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হয়।’ 

হাটে কথা হয় চাঁদপুরের কলা ব্যাপারী আজম মুরব্বির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি এখান থেকে কলা নিয়ে ঢাকা, সাভার, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি।’ 

চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, ‘কলা চাষে দিন দিন জেলার কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে।’এছাড়া মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলার বেশির ভাগ গ্রামে কলার চাষ বাড়ছে। 

মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক স্বপন কুমার খাঁ বলেন, ‘মেহেরপুরের মাটি কলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ কারণে জেলায় দিন দিন কলা চাষ বাড়ছে।’

ঝিনাইদহের বড় কলার হাট পবহাটিতে গিয়ে জানা যায়, তিন বছর করোনা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কলা চাষে চাষীরা লাভ করতে পারেননি। এবার সেখানে ভালো দাম পাচ্ছেন তারা। জেলা সদর, শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু ও কালীগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে কলা নিয়ে আসেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা। দেখা গেল  প্রকারভেদে প্রতি কাঁদি চাঁপা কলা ২০০-২৫০, সবরি ৪০০-৫০০, সাগরকলা ১৮০-২২০ ও ধূপছায়া কলা ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখান থেকে কলা পাঠানো হচ্ছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়।