টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণবিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে তিনি এ প্রকল্প উদ্বোধন করেন।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত গ্রাম তিনটি হলো দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিংগাছড়ি। এ প্রকল্পের আওতায় গ্রামগুলোতে পর্যায়ক্রমে দারিদ্র্য বিমোচন, জলাবদ্ধতা ও কৃষিজমি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল ও আধুনিক স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত তিনটি গ্রাম নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাঙ্গামাটির মিতিংগাছড়ি, খুলনার পানখালী এবং দিনাজপুরের নাফানগর গ্রামকে এসডিজি স্থানীয়করণের একটি পাইলট মডেল হিসেবে প্রাথমিকভাবে বেছে নেয়া হয়েছে। এ গ্রামগুলোতে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুল ড্রেস, মাদরাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, ওয়ান ভিলেজ-ওয়ান প্রডাক্ট, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও ইকো ট্যুরিজমসহ বিভিন্ন কর্মসূচি একযোগে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে।’
এ নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এ উদ্যোগের সাফল্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সারা দেশের অন্যান্য গ্রামেও এই মডেল সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আশা করি, এসডিজি ভিলেজ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘‘ডেভেলপমেন্ট মডেল’’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি দৃষ্টান্তমূলক প্লাটফর্ম হয়ে উঠবে।’
এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণবিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে ভঙ্গুর বাংলাদেশ এখন পুনর্গঠনের সময় এসেছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শোষণ-শাসন বাংলাদেশকে একটি ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশসহ সব ক্ষেত্রে ভঙ্গুর এ রাষ্ট্র এবার পুনর্গঠনের পালা। দেশ পুনর্গঠনের এ যাত্রা পথে এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। এরই অংশ হিসেবে জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। এ অবকাঠামো দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সঙ্গে সমন্বিত করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিএনপির জননীতির দিকে লক্ষ করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সব সময় দলটির সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি জনবান্ধব। তিনি বলেন, ‘দেশ ও জনগণের উন্নয়নে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিটিই মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) কিংবা বর্তমানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের (এসডিজি) ভিশন ও মিশনের সঙ্গে খুব বেশি অমিল নেই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ যেভাবে এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিল, এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথাযথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলছে। আপনারা লক্ষ করবেন, এসডিজির প্রতিপাদ্য ‘‘নো ওয়ান লিভ বিহাইন্ড’’ কিংবা ‘‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’’ মূলনীতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের জননীতিরও মিল রয়েছে। সব শ্রেণী-পেশা তথা জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে—সবার জন্য বাংলাদেশ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের গৃহীত ‘‘সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসন এসডিজির এ মূল অগ্রাধিকারগুলোই প্রতিফলিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি সুসংহত করতে বর্তমান সরকার ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্গঠন’ বা ‘রিকভারি-রিহ্যাবিলিটেশন-রিকন্সট্রাকশন’—এই থ্রি-আর কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে সাময়িক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তর—সবকিছুই একটি সুসংহত নকশায় বাস্তবায়িত হবে।’
সরকারের কর্মসূচি নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের রায়ে বর্তমান সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরদিন থেকেই নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক কার্ড, জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসাসেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ডের মতো একাধিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন করে চলছে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্পোর্টস কার্ড, সারা দেশে ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয়গুরুদেরও সম্মানী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো না কোনো উপায়ে দেশের প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় এবং আর্থিক সহায়তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সুচিন্তিত পথনকশা সরকারের রয়েছে।’
কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা।’
সম্মেলন নিয়ে তিনি বলেন, ‘আশা করি, তিনদিনের এ সম্মেলনে প্রতিটি সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অভীষ্টভিত্তিক অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেবেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। এর একটি হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। আরেকটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার হবে সর্বজনীন। এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত থাকবে। ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে আসুন আমরা সবাই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করি।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতার এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।










