আলু চাষের জন্য বিখ্যাত জয়পুরহাট জেলা। প্রতি বছর দেশের মোট উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলুর আবাদ হয় এ জেলায়। তাই মৌসুমের শুরু থেকেই জেলাজুড়ে আলু আবাদে ব্যস্ত সময় পার করেন চাষীরা। কিন্তু চলতি মৌসুমে আলু চাষের অন্যতম উপাদান বীজ ও টিএসপি সারের সংকট দুশ্চিন্তায় ফেলেছে চাষীদের। চাহিদামতো বীজ ও সার না পাওয়ায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে তাদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত আলু বীজ ও সারের জোগান নিশ্চিত না করা গেলে অনেক চাষীই আলু আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এর প্রভাব পড়বে গড় উৎপাদনে। যদিও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে আলুর দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কৃষক আলুর আবাদ করছেন। তাই সার ও বীজের সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ৪০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গত বছর ৩৮ হাজার ৩২৫ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছিল। গতবারের তুলনায় এবার ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বেশি আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আলু। তাই যেসব চাষী গত বছর আলুর আবাদ করেননি তারাও এবার আবাদ করছেন। এ কারণে জেলায় আলুবীজ ও টিএসপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে। আর এ সুযোগে ব্যবসায়ীরাও বীজ ও সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ‘এ’ গ্রেড আলুবীজ প্রতি বস্তা (৪০ কেজি) ১ হাজার ৮৮০ থেকে ১ হাজার ৯২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ‘বি’ গ্রেড আলুবীজ ১ হাজার ৮৪০ ও অন্যান্য জাতের আলুবীজ ১ হাজার ৮০০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বীজ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ৪০ কেজির প্রতি বস্তা অ্যাস্টেরিক, ক্যারেজ ও ডায়মন্ড জাতের আলুবীজ ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করছেন। একই অভিযোগ টিএসপি সার কিনতে আসা কৃষকদের। প্রতি বস্তা সারের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও সার সংকট দেখিয়ে কিছু কিছু ব্যবসায়ী নানা কৌশলে কৃষকদের কাছ থেকে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন।

জেলার কালাইয়ের মোলামগাড়ী হাট, মোসলেমগঞ্জ হাট, বৈরাগীহাট, নুনুজ, মাত্রাই, ক্ষেতলালের ইটাখোলা, চৌমুহনীসহ জেলার বিভিন্ন দোকানে আলুবীজ ও সার কিনতে আসা কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, সরকার কৃষকদের এত সহযোগিতা করলেও আমরা চাহিদামতো আলুবীজ ও টিএসপি সার পাচ্ছি না। যেটুকু পাচ্ছি, তাও আবার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

কালাই উপজেলার বৈরাগীরহাটের আলুবীজ ব্যবসায়ী শাহজাহান, সার ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান বলেন, আমরা নির্ধারিত দামেই আলুবীজ ও সার বিক্রি করছি। তবে কিছু কিছু এলাকায় ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নেয়ায় আমাদের দুর্নাম হচ্ছে। এছাড়া আমাদের দেয়া চাহিদামতো বীজ ও সার সরবরাহ করতে পারছে না সরকার। এ কারণেই এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোবারক হোসেন বলেন, সারের বেশি দাম নেয়ার অভিযোগ পেয়ে কয়েকটি দোকানে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের নিয়মিত মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক স ম মেফতাহুল বারি বণিক বার্তাকে বলেন, জয়পুরহাটে এ বছর আলুবীজের কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। আলুবীজ ও টিএসপি সারের চাহিদা এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে চাহিদামতো বীজ ও সার সরবরাহ করা হবে।

বিএডিসির বীজ বিপণনের (জয়পুরহাট ও বগুড়া আঞ্চল) যুগ্ম পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, গত বছর আলুবীজের চাহিদা ছিল দুই হাজার টন। কিন্তু সেই চাহিদা মোতাবেক আলুবীজ বিক্রি হয়নি। এজন্য আমরা এবার চাহিদা বাড়াইনি। এ বছর আলুর দাম বেশি হওয়ায় চাষীরা ব্যাপকভাবে আলু চাষে ঝুঁকছেন। এজন্য আলুবীজ ও টিএসপি সারের চাহিদা বেড়ে গেছে। টিএসপি সারের দুই হাজার টনের চাহিদা ছিল, সেটি সরবরাহ করা হয়েছে। তার পরও স্থানীয় কমিটি টিএসপি সারের চাহিদার প্রস্তাব করলে সেটিও সরবরাহ করা হবে। কেউ নির্ধারিত দামের বেশি নিয়ে থাকলে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।

তিনি আরো বলেন, জয়পুরহাট জেলায় বীজ সংরক্ষণের জন্য সরকারিভারে একটি হিমাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। স্থান নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। হিমাগারটি নির্মাণ হলে কৃষকদের এসব সংকট আর থাকবে না।