বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কে আলোকায়নের জন্য সাড়ে তিন বছর মেয়াদি ২৬১ কোটি টাকার প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জুনে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো ঠিকাদারই নিয়োগ দিতে পারেনি প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের শর্তারোপ নিয়মানুযায়ী না হওয়ায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অর্থছাড় হয়নি বলে জানিয়েছেন চসিক কর্মকর্তারা। এদিকে নতুন করে প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে, যাতে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, কোনো প্রকল্প গ্রহণের সময় নগরবাসীর চাহিদা ও ব্যয়ের বিষয়টি মাথায় রাখা হয়। বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে কাজ শুরু করা হলেও শেষ করার জন্য সময় বৃদ্ধির আবেদন করা হয় এমনটি বারবার দেখা যায়। কিন্তু চসিকের ২৬১ কোটি টাকার আলোকায়ন প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো শুরুই হয়নি। এমনকি ঠিকাদার নিয়োগও করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কাজ শুরু না করা চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ‘মডার্নাইজেশন অব সিটি স্ট্রিট লাইট সিস্টেম অ্যাট ডিফারেন্ট এরিয়া আন্ডার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন’ শীর্ষক প্রকল্পটিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সড়কে আলোকায়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ২০১৮ সালে। প্রায় ২৬০ কোটি ৮৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ৯ জুলাই জাতীয় একনেক বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় জানুয়ারি ২০১৯-২১-এর জুন পর্যন্ত। তবে প্রকল্পটির জটিলতার কারণে প্রকল্পের সংশোধিত বাস্তবায়নকাল এক বছর বাড়িয়ে ধরা হয় জুন ২০২২ পর্যন্ত। এদিকে সংশোধিত মেয়াদও শেষ হওয়ায় নতুন করে আরো এক বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে চসিক।
প্রকল্পটিতে মোট ব্যয়ের মধ্যে ভারতের এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়া দেবে ২১৪ কোটি ৪৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা বা ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ, অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পটিতে ব্যয় করবে ৪৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার টাকা বা ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। প্রকল্পের মাধ্যমে ৪৬৬ কিলোমিটার সড়ক আলোকায়ন করা হবে। পোলসহ (কেবল, সার্ভার) প্রতিটি এলইডি বাতি স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ১ লাখ ৯ হাজার টাকা।
প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ৫ ফুটের বেশি প্রশস্ততার ১০ কিলোমিটার সড়ক এলইডি বাতির আওতায় আসবে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এ বাতি পাঁচ বছর পর্যন্ত জিরো রক্ষণাবেক্ষণ খরচে চলবে। ওয়ার্ডগুলোতে ৪০, ৬০, ১০০ ও ২৫০ ওয়াটের মোট ২০ হাজার ৬০০টি এলইডি বাতি, ২০ হাজার ২৬৭টি জিআই পোল এবং ৫০৭টি কন্ট্রোল সুইচ বক্স বসানো হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ বিল কমে যাওয়াসহ বাতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয়ভাবে চারটি সার্ভার স্টেশন স্থাপন করা হবে।
এদিকে প্রকল্পের কাজ জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো শুরু করতে পারেনি চসিক কর্তৃপক্ষ। এমনকি প্রকল্পটির জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ঠিকাদারও নিয়োগ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। মূলত প্রকল্পটির কাজের বিষয়টি বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কভিডের অজুহাত তোলা হলেও সাবেক মেয়র এবং বর্তমান মেয়রের অনুসারী কর্মকর্তাদের কাজের ক্ষেত্রে অনীহা থাকায় প্রকল্পটির কাজ শুরু করা যায়নি।
এদিকে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি অনুমোদন হয় ২০১৯ সালের ৯ জুলাই। কিন্তু প্রকল্পকাজের মেয়াদ শুরুতে ধরা হয় সেই বছরের জানুয়ারি থেকেই। অন্যদিকে প্রকল্পের কাজ শুরুর দিকেই চসিকের মেয়র পরিবর্তন হওয়া এবং ২০২০ সালের কভিড মহামারীর সময়ে প্রকল্পের দাতা সংস্থা ভারতের এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়া কর্তৃক পরিচালিত সক্ষমতা জরিপ (প্রি-কোয়ালিটি) প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে আট মাসের বেশি সময় লেগে গেছে। যার কারণে প্রতিষ্ঠানটির দেয়া নিয়মকানুন মেনে কাজ শুরু করতে সময় লেগে গেছে প্রায় এক বছরের বেশি। তাছাড়া ভারতের ব্যাংক এবং মন্ত্রণালয়ের রিভিউর যথাযথ অনুমোদন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে পিপিআরের গাইডলাইন সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করতে এবং ফান্ডিং আসতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পটি শুরু করা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে আলোকায়ন প্রকল্পটির পরিচালক চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পটির মেয়াদ গত মাসে শেষ হলেও কিছু জটিলতার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে এক বছর সময় বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আমরা চিঠি পাঠিয়েছি। তাছাড়া প্রকল্পের কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানসহ ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে সময়সীমা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে কিনা সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে চসিকের কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় যন্ত্রাংশ কেনাকাটা এবং ঠিকাদারের কাজের বিভিন্ন শর্ত দেয়া হয় একনেক থেকে। কিন্তু প্রকল্পটিতে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঠিকাদার নিয়োগে চসিক থেকে যে শর্ত দেয়া হয়েছিল সেটা একনেকের শর্তানুযায়ী না হওয়ায় একনেক প্রকল্পের সময় চলাকালে অর্থ ছাড় করেনি। এমনকি প্রকল্পের কাজ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চসিকের কোনো কর্মকর্তাকে পরামর্শক হিসেবে রাখা হয়নি, যার কারণে প্রকল্পের কাজের মেয়াদ শেষ হলেও কাজই শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, চসিক কর্মকর্তাদের অনীহা এবং অদূরদর্শিতার কারণে এ প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। মূলত কোনো প্রকল্প পাস করার আগে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্টাডি করা হয়। সেখানে এত বড় একটা প্রকল্প নেয়ার পরও কী এমন জটিলতা তৈরি হলো যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কাজ শুরু করা যায়নি। প্রকল্প গ্রহণের সময় আমরা কাজের তোড়জোড় দেখি কিন্তু মূল প্রকল্পের কাজ শেষ করতে এতটা আগ্রহ তাদের নেই।










