বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে শুরু হয়েছে চাষাবাদ। বিভিন্ন সবজির পর এবার চীনাবাদাম চাষ করে লাভবান হতে যাচ্ছেন চাষীরা। অনাবাদি বালুচরে চীনাবাদাম চাষ করে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন চাষীরা। বর্তমানে বাদামের চারায় সবুজ হয়ে আছে বিস্তৃত চর। বিঘাপ্রতি ৫-৬ হাজার টাকা লগ্নি করে কাঁচা বাদাম বিক্রি হবে অন্তত ২১ হাজার টাকার। পতিত চরে বাদাম চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ায় অনেক চাষীর পরিবারে সচ্ছলতা ফিরেছে।

জানা যায়, বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলাটি যমুনা ও বাঙ্গালী নদী দিয়ে ঘেরা। প্রতি বছর জুলাই-আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ উপজেলায় দফায় দফায় বন্যা হয়। বন্যায় বসতভিটা, আবাদি জমি ভেঙে নদীগর্ভে চলে যায়। এরপর বন্যার পানি নেমে গেলে নভেম্বর-ডিসেম্বরে জেগে ওঠা চরের জমির প্রকৃতি বুঝে স্থানীয় চাষীরা বিভিন্ন ফসল চাষ করেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষীরা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে টিকে থাকতে জেগে ওঠা বালুচরে ডিসেম্বরের শেষে বাদাম চাষ করেন। 

উপজেলার চরগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্নিবাড়ী, ইন্দুরমারা চর, কাজলা, বোহাইল, ধারাবর্ষা, চন্দনবাইশা ইউনিয়নের টেকামাগুড়া। প্রতি বছর বন্যায় বালি পড়ে বিশাল এলাকা অনাবাদি হয়ে যায়। এসব অনাবাদি বালি জমিতে এ বছর কৃষক আগাম চীনাবাদামের আবাদ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বেড়ে ওঠা চীনাবাদামের গাছ ভালো ফলনের জানান দিচ্ছে। সেই বাদাম কোথাও পরিপক্ব হয়েছে আবার কোথাও উত্তোলন চলছে। ফলন ভালো হওয়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষীরা বাদামে স্বপ্ন বুনছেন। 

বাদাম চাষীরা জানান, বালুচর হলেও বন্যার কারণে পলিও পড়ে। যে কারণে চরে চাষাবাদ করা যায়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে কোনো রূপ চাষ ছাড়াই বাদাম আবাদ করা যায়। লাঙল দিয়ে চাষ করে লাইন করে বীজ বপন করা হয়। বাদামের জমিতে চাষ, সার প্রয়োগ, নিড়ানি এবং সেচ দেয়ার তেমন প্রয়োজন হয় না। বেশি ভালো ফলনের জন্য কিছু সার ছিটাতে হয়। সার, বীজ ও শ্রমিক বাবদ বিঘাপ্রতি ৫-৬ হাজার টাকা খরচ হয়। মার্চের শেষে ও এপ্রিলের শুরু থেকে চীনাবাদাম জমি থেকে উত্তোলন শুরু হয়। বেশির ভাগ জমিতে এখন বাদামের গাছগুলো বড় হয়েছে। প্রতিটি গাছের গোড়ায় থোকা থোকা বাদাম ধরেছে। বাদামের চারার পাতা হলুদ হয়ে খসে পড়তে থাকলে বাদাম জমি থেকে উত্তোলন করা হয়। কিছু জমিতে আগাম চাষের কারণে এরই মধ্যে চীনাবাদাম উত্তোলন করা হচ্ছে। 

সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটির সম্পূর্ণ এবং বাকিগুলোর আংশিক ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে। প্রতি বছর বন্যায় এসব জমিতে বালি পড়ে বিশাল এলাকা অনাবাদি হয়ে যায়। কৃষকের সেরা জমিগুলো বন্যায় বালি পড়ে অনাবাদি থাকায় আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারেনি, কিন্তু কয়েক বছর ধরে চরের অনাবাদি জমিতে চাষীরা নদীর পানি সেচ দিয়ে চাষবাস শুরু করেছেন। অনাবাদি জমিগুলোয় এ বছর কৃষক আগাম চীনাবাদামের আবাদ করেছেন। গত বছর ৯৬৫ হেক্টর জমিতে চীনাবাদাম চাষ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ১ হাজার ৪৯৮ টন। এ বছরও চীনাবাদামের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৬৫ হেক্টর। চাষ হয়েছে ৮৮০ হেক্টর। এ পর্যন্ত ২৬০ হেক্টর জমির চীনাবাদাম কর্তন করে ফলন ঘরে তোলা হয়েছে।

সারিয়াকান্দি উপজেলার সদর ইউনিয়নের অন্তারপাড়া গ্রামের বাদামচাষী তুহিন মিয়া জানান, কয়েক বছর ধরেই তিনি বাদামের চাষ করে ভালো লাভবান হচ্ছেন। এ বছরও তিনি ছয় বিঘা জমিতে চীনাবাদাম চাষ করেছেন, ফলন খুবই ভালো হয়েছে। বাজারে বাদামের দাম ভালো থাকায় তিনি লাভবান হবেন বলে আশা করছেন। 

কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের নান্দিনার চরের কৃষক আজমল মিয়া প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে ও আফজাল হোসেন ১৬ বিঘা জমিতে চীনাবাদাম চাষ করেছেন। তারা এখন জমি থেকে বাদাম তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সারিয়াকান্দি বাজারের ব্যবসায়ী মতি মিয়া জানান, বর্তমানে কাঁচা বাদামের বাজারদর মোটামুটি ভালো। এ বছর কাঁচা বাদাম প্রতি মণ ২০০০-২ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হালিম জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কৃষক আগাম চীনাবাদাম চাষ করেছেন। ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে কৃষক ৮-১০ মণ করে চীনাবাদামের ফলন পাচ্ছেন। প্রতি বিঘা থেকে বাদাম বিক্রি হবে ২০-২১ হাজার টাকা। চাষীদের বাদাম চাষ করতে অর্ধেক খরচও হয় না। বাজারে ভালো দাম রয়েছে বিধায় কৃষক ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন।