স্থানীয় উৎপাদন কমে আসায় গ্যাস সংকটের কারণে বিভিন্ন সময় বন্ধ রাখতে হয়েছে সারকারখানা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। একই কারণে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ৬ ঘণ্টা করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে সম্প্রতি দৈনিক ৪ ঘণ্টা গ্যাস ব্যবহার না করতে শিল্প-কারখানাগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে কয়েক বছর আগে থেকে গ্যাস আমদানি শুরু হলেও সংকটের তীব্রতায় এখন রেশনিং করতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যটির মূল্যের অস্থিতিশীলতায় এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা সহসাই কাটছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য বলছে, বর্তমানে যে হারে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ জ্বালানি পণ্যটির অভ্যন্তরীণ মজুদ ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসবে। গত অর্থবছরেও (২০২০-২১) দেশে দৈনিক চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় সরবরাহের ঘাটতি ছিল ১৮৮ কোটি ঘনফুট। ২০২৫ সাল নাগাদ তা বেড়ে ৩৯০ কোটি ঘনফুট হবে। ২০৩০ সালে এ ঘাটতি আরো বেড়ে দাঁড়াবে ৫৫৮ কোটি ঘনফুটে।
অন্যদিকে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পাশাপাশি স্থানীয় মজুদ ফুরিয়ে আসছে দ্রুতই। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়ায় ও আমদানি সরবরাহ না বাড়ায় জ্বালানি পণ্যটি নিয়ে এরই মধ্যে শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও জ্বালানি বিভাগ বলছে, আগামীতে আমদানীকৃত গ্যাস দিয়েই শিল্প খাত পরিচালিত হবে।
গ্যাসের বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, স্থানীয় মজুদ যে হারে কমছে তাতে আগামী এক দশক পর দেশে গ্যাস চাহিদার ৮৫ শতাংশ আমদানি করে মেটাতে হবে। কয়েক বছর ধরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে গ্যাসের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করতে হচ্ছে। তবে বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ সংকট পরিস্থিতির জন্য মূলত বিদ্যমান এলএনজির অবকাঠামো ও বৈশ্বিক বাজারদরকে দায়ী করছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে জাতীয় গ্রিড লাইনে যে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে এটি আমাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা। নতুন টার্মিনাল না আসা পর্যন্ত আমাদের আমদানি সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। আগামী দু-এক বছরের মধ্যে এলএনজির তৃতীয় টার্মিনাল সরবরাহ লাইনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে গ্যাস সরবরাহে বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে এর চেয়ে বেশি সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। তাদের ভাষ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি উচ্চমূল্য, স্থানীয় সরবরাহ সংকট এবং আমদানির বিদ্যমান সরবরাহ সক্ষমতায় বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ এ রকমই থাকবে। নতুন করে গ্যাসক্ষেত্র এবং এলএনজি সরবরাহের অবকাঠামো নির্মাণ করার পর নতুন গতি আসতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৪৫০ কোটি ঘনফুটের মতো। স্থানীয় উৎস ও এলএনজি দিয়ে মোট সরবরাহ হচ্ছে ৩১০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। কভিড মহামারীর শুরু থেকে চাহিদা ও সরবরাহে ১৪০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট গ্যাসের ৪১ দশমিক ৮১ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এরপর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ক্যাপটিভে, ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। আবাসিকে ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ ও শিল্পে ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয়েছে। সার উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার হয়েছে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ গ্যাসের ব্যবহার ছিল সিএনজিতে। বাকি গ্যাস ব্যবহার হয়েছে বাণিজ্যিক ও অন্যান্য খাতে।
আগামীতেও রেশনিং ব্যবস্থা থাকবে কিনা তা বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারদরের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বর্তমানে নাজুক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। শিল্প খাতে গ্যাসে যে রেশনিং করা হচ্ছে সেটি অর্থনীতির জন্য একটি খারাপ দিক। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে।
জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, এই মুহূর্তে এর চেয়ে গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। দেশে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র এবং এলএনজি নতুন কোনো অবকাঠামো তৈরি করা না গেলে এ সরবরাহ দিয়েই চলতে হবে। তাছাড়া জ্বালানির বৈশ্বিক যে দর তাতে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনারও পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ফলে এ সরবরাহ সক্ষমতা দিয়েই চলতে হবে চলতি মৌসুমে। মূলত বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ার কারণে গ্যাসের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত অর্থবছরে গ্যাসের দৈনিক গড় চাহিদা ছিল ৪৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে স্থানীয় উত্তোলন ও আমদানীকৃত এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হয়েছে ৩০১ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে চাহিদার বিপরীতে দৈনিক সরবরাহের ঘাটতি ছিল প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুট। আমদানীকৃত এলএনজির সরবরাহ বাদ দিলে গত অর্থবছরে স্থানীয় গ্যাসের দৈনিক ঘাটতি ছিল প্রায় ১৮৮ কোটি ঘনফুট।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে প্রতিদিন ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ১০০-১১০ কোটি ঘনফুটের মতো। প্রতিনিয়ত চাহিদা-সরবরাহে ঘাটতি থাকছে ৪০-৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলেই বিদ্যুতে এর প্রভাব ব্যাপক হারে লক্ষ করা যায়। প্রতি বছর উৎপাদনমুখী শিল্প খাত বাড়ছে, অন্যান্য শিল্প-কারখানা বাড়ছে। এসব জায়গায় বিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ানো যায়নি গ্যাসের সরবরাহ। গ্যাসের উৎপাদন ও আমদানি না বাড়লে আগামীতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে রেশনিং একমাত্র বিকল্প ব্যবস্থা।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬৫টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। গ্যাস সংকটে ২০১২ সাল থেকে ২১০ মেগাওয়াট সক্ষমতার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও বন্ধ রয়েছে ২০২০ সাল থেকে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার হয়তো বিভিন্ন খাতে রেশনিং করছে। রোজার পরে শিল্প খাতে রেশনিং উঠে গেলেও সিএনজি খাতে থাকবে। কারণ সেখানে গ্যাসের বড় একটি অংশ সরবরাহ করা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে রেশনিং ব্যবস্থায় যেতে হবে কিনা তা নির্ভর করছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আকস্মিকভাবে কমে গেলে।
গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমের পাশাপাশি রমজানের কারণে এখন বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা এখন ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে রেশনিং করা হচ্ছে। রমজান ও সেচ মৌসুম শেষ হলে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাবে, তখন সব খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।










