দেশে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার যাত্রা ১৯৯২ সালে। তিন দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮-এ। সংখ্যার এ উল্লম্ফনের সঙ্গে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। গবেষণা ও গ্রন্থাগার উন্নয়নের মতো উচ্চশিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো থাকছে একদমই অবহেলিত। ন্যূনতম অবকাঠামো ও শিক্ষক নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকের আজ তৃতীয় পর্ব
দেশে বর্তমানে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৮। এর মধ্যে আইন কিংবা নিয়ম ভাঙছে না—এমন বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া কঠিন। অবৈধ ক্যাম্পাস ও প্রোগ্রাম পরিচালনা, সনদ বাণিজ্য ও ট্রাস্টিদের লুটপাটসহ আরো নানা কারণে ভাবমূর্তির সংকটে গোটা বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাত। শিক্ষক ও অবকাঠামোর দুরবস্থার কারণে প্রতি শিক্ষাবর্ষেই বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা থাকছে। যদিও এমন বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও প্রায় প্রতি বছরই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরো বেশকিছু বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে দেশে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পায়। আর এর পরের ১২ বছরে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৫৭টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশেরই অনুমোদন দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়।
গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পায়। পরের বছর অনুমোদন দেয়া হয় আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের। গত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর ১৮টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিলে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৮-এ। এরপর ২০১৪ সালে দুটি, ২০১৫ সালে পাঁচটি ও ২০১৬ সালে ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন লাভ করে। ২০১৭ সালে নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না পেলেও ২০১৮ সালে আরো আটটি ও ২০১৯ সালে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। এমনকি করোনার প্রাদুর্ভাবে যখন থমকে ছিল বিশ্ব, তখনো বন্ধ ছিল না দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন। ২০২০ সালে একটি ও সর্বশেষ ২০২১ সালে আরো দুটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বেসরকারি খাতের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নজর না দিয়ে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অনুমোদন দেয়াকে অযৌক্তিক বলছেন শিক্ষাবিদরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, উচ্চশিক্ষার প্রসারের নামে দেশে নামে-বেনামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর অধিকাংশই আসন অনুপাতে শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। এর পরও নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না দিয়ে উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো স্থাপনের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে। আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ব্যবসায়িক চিন্তা বাদ দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে।
দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৮টি হলেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে ১০৩টি। এর মধ্যে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ উভয় পদে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ দেয়া বৈধ কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেগুলো প্রতিষ্ঠার ২০ বছরেও কোনো বৈধ উপাচার্য নিয়োগ দিতে পারেনি। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল কিংবা ফাইন্যান্স কমিটি—অত্যাবশ্যকীয় এসব পর্ষদের কোনো সভা না করেই বছরের পর বছর উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়। আর ট্রাস্টিদের দ্বন্দ্ব, অবৈধ ক্যাম্পাস ও প্রোগ্রাম পরিচালনা কিংবা আসনের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগ উঠছে হরহামেশা। এছাড়া শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাও ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি মাত্র ১০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিয়োগ দিতেও দেখা যাচ্ছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়কে। ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় ভবন ছাড়তে হচ্ছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়কে। আর্থিক সংকটে অনেক অত্যাবশ্যকীয় ল্যাব প্রতিষ্ঠা করছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আইনে নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ সময় পার করেও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাচ্ছে ২০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়।
কার্যক্রম পরিচালনায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন এমন সংকটে, তখন নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কতটা যৌক্তিক? এ প্রশ্নের জবাবে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, আমি মনে করি, পাড়া-মহল্লায় এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়ার দরকার নেই। মুড়িমুড়কির মতো এভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা তথাকথিত শিক্ষিত বেকার তৈরি করছি। আমার মতে, যেগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়েছে, আগে সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া প্রয়োজন।
বছরপ্রতি নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হলেও শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে বেশ সংকটে রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সামনের কাতারের কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই আসনের অর্ধেক শিক্ষার্থীও পাচ্ছে না। এমনকি করোনাকালে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ আসনও ফাঁকা ছিল। ইউজিসির হিসাবে, ২০২০ সালে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বমোট শিক্ষার্থী আসন সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৫৫। আর ওই বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী পেয়েছে ৯৯ হাজার ৭৭১ জন। সে হিসাবে ২০২০ সালে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসনের ৬৫ শতাংশই খালি ছিল।
এদিকে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরো কয়েকটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অন্তত আরো ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব জমা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি অনুমোদনের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। ইউজিসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিনই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রক্রিয়া জানতে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। আর আবেদন জমা দেয়া ব্যক্তি ও গ্রুপের মধ্যে অন্তত অর্ধশতাধিক জোর তদবিরে ব্যস্ত। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ভালো চলছে না, সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান কী করে চলবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন সরকার দেয়, কমিশন নয়। তবে নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেয়ার চেয়ে এগুলোর মানের দিকে আমাদের নজর দেয়া প্রয়োজন। কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা খুঁজে পেলে আইনের আলোকে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সেখানকার শিক্ষার্থী সংখ্যায় উল্লম্ফন ঘটলেও জাতীয় অর্থনীতিতে খুব বেশি অবদান রাখতে পারছে না সিংহভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। উল্টো সনদসর্বস্ব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে একধরনের চাপ তৈরি করছে। ‘ফ্যাক্টর অ্যাফেক্টিং দ্য এমপ্লয়বিলিটি অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েটস’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্নাতক সম্পন্ন করে বের হওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যেই ভাষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া সেকেলে পাঠ্যক্রমে পাঠগ্রহণ আর নতুন শিল্প-প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় না থাকায় গ্র্যাজুয়েটদের নিয়োগ দিলেও কাঙ্ক্ষিত আউটপুট পায় না চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
গুণগত মানে নজর না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর সমালোচনা করে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নিয়োগ দিতে গিয়ে যে মানের গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছি, তা সত্যিই হতাশাব্যঞ্জক। দক্ষতা উন্নয়নে জোর না দিয়ে শুধু সার্টিফিকেট হাতে ধরিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারে পাঠানো হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, আমরা সংখ্যায় খুব জোর দিয়ে ফেলছি, যা টেকসই উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই নামেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে এখন আমাদের মানসম্মত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন।










