যশোর ও নড়াইলে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই চলাচল করছে পাঁচ হাজারের বেশি বড় গাড়ি। আবার এসব গাড়ির বেশির ভাগেরই নেই ফিটনেস। ফলে এ দুই জেলার বিভিন্ন রুটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা চলাচল করছেন। বিআরটিএ থেকে বারবার তাগিদ দেয়া হলেও মালিক পক্ষ গাড়ির ফিটনেস ঠিক করছে না। আবার চালকরা আবেদন করেও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন না।

যশোর বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা গেছে, যশোর ও নড়াইল জেলা নিয়ে তাদের কার্যক্রম। এ দুটি জেলায় মোট ৫ হাজার ৮০০ রেজিস্ট্রেশন করা গাড়ি রয়েছে, এর মধ্যে ফিটনেস রয়েছে দুই হাজার গাড়ির। ৯০ শতাংশ গাড়ি যশোরের। আর চালকের লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৫০৮টি। চালকের লাইসেন্স ছাড়াই চলাচল করছে ৫ হাজার ২৯২টি গাড়ি।

যশোর জেলা শহর থেকে প্রতি ১০ মিনিট পর পর যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যায় চৌগাছার উদ্দেশে। টার্মিনাল থেকে ছাড়ার সময় এসব বাসে সিট গুনে যাত্রী থাকলেও পথে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ বাড়ে। শুধু ভেতরে নয়, ছাদেও গাদাগাদি করে বসেন যাত্রীরা। ফলে যাত্রা পথেই কোনো কোনো গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় স্টার্ট। তখন যাত্রীদের নামিয়ে ধাক্কা দিয়ে চালু করতে হয় গাড়ির ইঞ্জিন। বিকট আওয়াজ করে বেপরোয়া গতিতে চলা এসব গাড়ির প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

সম্প্রতি এ সড়কে চলা একটি বাসের চালক সামনে আসা এক পথচারীকে বাঁচাতে হার্ড ব্রেক ধরেন। তখন নিচ থেকে যন্ত্রাংশ খুলে পড়লে বাসটি আর গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। বাধ্য হয়ে যাত্রীরা অন্য গাড়ি করে গন্তব্যে যায়। এমন বেহাল গাড়ি শুধু যশোর-চৌগাছা নয়, যশোর-কেশবপুর, বাঘারপাড়া, বেনাপোল, নড়াইল ও মাগুরা সড়কে প্রতিনিয়ত চলছে। যাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

যশোর বাস মালিক সমিতির সভাপতি বদরুজ্জামান বাবলু জানান, যশোর-সাতক্ষীরা, যশোর-মাগুরা, যশোর-চৌগাছা, যশোর-ফরিদপুর, যশোর-বরিশাল, যশোর-ছুটিপুর-বেংদাহ, যশোর-রাজগঞ্জ, ঝিকরগাছা-বাঁকড়া, নাভারণ-সাড়াতলা, যশোর-নারকেলবাড়িয়াসহ এ অঞ্চলের সড়কগুলোয় এক হাজার হাজার বাস, মিনিবাস চলাচল করে।

যশোর আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঈগল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী পবিত্র কাপুড়িয়া বলেন, ‘যশোরে নয়টি মালিক সমিতির অধীনে থাকা এসব গাড়ির মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ গাড়ির ফিটনেস নেই।এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দীর্ঘদিন হালনাগাদ করা হয়নি। আশা করছি, মালিকরা তাদের বাসের ফিটনেস ঠিক করবেন। আর চালকরা বিআরটিএতে আবেদন করেও লাইসেন্স পাচ্ছেন না। সমস্যা হচ্ছে বিআরটিএর, আর দোষ হচ্ছে চালকদের।’

যশোর পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা মিঠু বলেন, ‘বাস চালকরা আবেদন করেও লাইসেন্স পাচ্ছেন না। শ্রমিকদের লাইসেন্স না থাকলে কোনো দুর্ঘটনা হলে হত্যা মামলা হতে পারে। এজন্য আমরা সবাইকে লাইসেন্স করতে তাগাদা দিচ্ছি। আবার মালিক পক্ষকেও দেখতে হবে তিনি যার কাছে গাড়ি চালাতে দিচ্ছেন তার লাইসেন্স রয়েছে কিনা।’

বিআরটিএর যশোর অফিসের সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান জানান, ‘তিন হাজার ৮০০ গাড়ির কোনো ফিটনেস নেই। বেশির ভাগ গাড়িগুলো যশোর জেলায় চলাচল করে। এ কারণে সরকার যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে পুলিশি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করার দাবি জানান।

যশোর ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক খন্দকার মশিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত মাসেও আমরা ২৩৫টি মামলা করেছি। আর ২০২১ সালে ট্রাফিক পুলিশ ১৭ হাজার বিভিন্ন গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করে জরিমানা আদায় করে ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।’

জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমাদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফিটনেসবিহীন মোটরযানের তালিকা তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিআরটিএর পাশাপাশি মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন যৌথভাবে এজন্য কাজ করছে। এরই মধ্যে গাড়ি সংস্কার ও কাগজপত্র হালনাগাদের জন্য নোটিস জারি করেছে বিআরটিএ। গাড়ির মালিকরা যদি শিগগিরই ফিটনেস নবায়ন না করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’