মেঘালয়ের পাহাড়ঘেঁষা সীমান্তবর্তী ময়মনসিংহের দুই উপজেলা ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাট। উপজেলা দুটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় নিচে থাকায় আবাদের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন কঠিন ও ব্যয়বহুল। শুধু সেচের অভাবে বোরো মৌসুমে আবাদযোগ্য ১ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। তবে সীমান্তবর্তী নদীগুলোয় তিনটি রাবার ড্যাম ও ছয়টি স্লুইস গেট স্থাপনের ফলে ফসলি জমিগুলো চাষের আওতায় এসেছে। কৃষক এসব জমিতে বোরো ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, শসা, ঝিঙ্গে ও লাউসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করছেন।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এক সময় সীমান্তের জমিগুলোয় শুধু রোপা আমন ধান চাষ হতো। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ছিল এক আতঙ্কের নাম। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে বিপুল পরিমাণ জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্রে জানা গেছে, হালুয়াঘাটের ভুবনকুড়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীকুড়া এলাকায় মেনংছড়া নদীর ওপর রাবার ড্যাম নির্মাণ করেছে বিএডিসি। এছাড়া আচকিপাড়া-ধুপাঝুড়ি এলাকার সওল নদীর বিষ্ণজুড়ি খালে এবং গাজীরভিটা ইউনিয়নের ডাকিয়াপাড়া এলাকায় গুমুরিয়া নদীর ওপর স্লুইস গেট নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। একই ইউনিয়নের সূর্যপুর এলাকায় বোরাঘাট নদীর ওপর রাবার ড্যাম স্থাপনের ফলে এসব অঞ্চলের শত শত হেক্টর ফসলি জমি বোরো চাষের আওতায় এসেছে। শুধু বোরো নয়, পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করছেন এসব এলাকার কৃষক।

হালুয়াঘাট উপজেলার ডাকিয়াপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুল হাই বলেন, ‘বান্দরকাটা, শিমুলকুচি, বরাক, বালুয়াকান্দা, লামুক্তা ও ডুমনিকুড়া এলাকার প্রায় ৪০০ একর জমিতে শুধু পানির অভাবে বোরো আবাদ হতো না। গুমুরিয়া নদীর ওপর স্লুইস গেট নির্মাণের পর থেকেই দৃশ্য পাল্টেছে। যেখানে বোরো আবাদ কল্পনাও করতে পারতাম না, সেখানে ৭ একর জমিতে প্রতি বছরই বোরো আবাদ করছি।’

হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, এ বছর বোরো মৌসুমে উপজেলায় ২২ হাজার ৯৪৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। আর সীমান্তে রাবার ড্যাম ও স্লুইস গেটের মাধ্যমে ৬৮০ হেক্টর জমি বোরো মৌসুমে আবাদের আওতায় এসেছে। এতে করে সীমান্ত অঞ্চলে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।’

কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘এক সময় আমাদের ফসলি জমিগুলো পানির অভাবে অনাবাদি পড়ে থাকত। কিন্তু রাবার ড্যাম হওয়ার পর থেকে শত শত একর জমি চাষের আওতায় এসেছে। অল্প খরচে এখন নদীর পানি পাওয়া যায়। আমার তিন একর জমিতে এখন প্রতি বছর আবাদ করছি। এক সময় এসব জমিতে বোরো আবাদ করার কথা কল্পনাও করতে পারিনি।’

তবে স্থানীয়রা বলছেন, রাবার ড্যাম ও স্লুইস গেটগুলো পরিকল্পিতভাবে স্থাপন করলে কৃষকের আরো বেশি উপকার হতো। শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আচকিপাড়া-ধুপাঝুড়ি এলাকার সওল নদী বিষ্ণজুড়ি খালে স্লুইস গেট ও লক্ষ্মীকুড়া এলাকার মেনংছড়া নদীর ওপর রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা ঘেঁষে। এতে অনেক ফসলি জমি আবাদের আওতায় আসেনি। বাংলাদেশের কৃষকের চেয়ে ভারতীয় কৃষরাই লাভবান বেশি হচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশের আরো অভ্যন্তরে এসব রাবার ড্যাম ও স্লুইস গেট স্থাপন করা গেলে অনেক জমি আবাদের আওতায় আসতো।’

নদীপাড়ের বাসিন্দাদের কথা চিন্তা না করে অস্থায়ীভাবে পানি সংরক্ষণের জন্য মাটি দিয়েই নদীর পাড় উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাড় ভেঙে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানান লিটন মিয়া নামে এক কৃষক।

ডাকিয়াপাড়ার গুমুরিয়া নদীপাড়ের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, স্লুইস গেট পাকা। তবে বর্ষায় পাহাড়ি ঢল এসে সবকিছু নদীতে ভেসে যায়। অনেক পুকুরের মাছ, গো-খাদ্য, কাঁচা ঘরের ক্ষতি হয় বেশি। বাড়িতে এমনও হয়, পানির কারণে রান্না বন্ধ থাকে। ফলে আমাদের সন্তানদের নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। বাড়ি থেকে কোথাও যেতে পারি না। প্রতি বছরই নদীর পাড় মেরামত করা হয়। আমরা গরিব মানুষ। সরকার তো আমাদের ক্ষতিপূরণ দেয় না।’

অন্যদিকে ধোবাউড়া উপজেলার গামারীতলা ইউনিয়নের রণসিংহপুর বাজার এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে একটি রাবার ড্যাম। এ কারণে ৫০০ হেক্টর জমি নতুন করে চাষের আওতায় এসেছে। ধান চাষের কারণে ওই এলাকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। এছাড়া আরো ছয়টি নদীতে স্লুইস গেট স্থাপনের কারণে আরো ৭০০ হেক্টর জমি চাষের আওতায় এসেছে।’

এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসরিন আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সীমান্তে রাবার ড্যাম ও স্লুইচগেচের মাধ্যমে ১ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমি বোরো মৌসুমে আবাদের আওতায় এসেছে। এতে করে সীমান্ত অঞ্চলে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এজন্য আমরা কৃষকদের সহযোগিতা করছি।’