দেশে বিদেশী ঋণের প্রবাহ কেমন হবে বছর দুয়েক আগে তার একটি প্রক্ষেপণ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রক্ষেপণ ছিল, দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক গতিতে বাড়লে ২০২৩ সাল শেষে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৭৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে। রক্ষণশীল মাত্রায় বাড়লে বিদেশী ঋণ ৬৭ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ থাকবে। আর সর্বোচ্চ (উচ্চাভিলাষী) মাত্রায় বাড়লেও ২০২৩ সাল শেষে বিদেশী ঋণের পরিমাণ হবে ৮০ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও বিদেশী ঋণপ্রবাহের এ প্রক্ষেপণ বেশ আগেই ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের জুনেই বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ প্রক্ষেপণের চেয়ে দেশে বিদেশী ঋণের পরিমাণ এখন ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। 

বিদেশী ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ প্রক্ষেপণ তুলে ধরা হয়েছিল ‘ইকোনমিক অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ইমপ্লিকেশনস অব কভিড-১৯: বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যান্ড গভর্নমেন্টস পলিসি রেসপন্স’ শীর্ষক বিশেষ প্রকাশনায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বিভাগের তৈরি করা ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২১ সালের মার্চে। প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের বিদেশী ঋণপ্রবাহের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এতে সরকারি-বেসরকারি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশী ঋণকে আমলে নেয়া হয়। 

বিশেষ ওই প্রকাশনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ছিল, ২০২০ সালে বিদেশী ঋণ বাড়ে ৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। আশা করা যায়, ২০২১ সালে বিদেশী ঋণপ্রবাহ বাড়বে। এরপর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে ২০২৩ সালে বিদেশী ঋণের স্থিতি ৭৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। দেশে বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভরশীল অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। আরো অনেক মেগা প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশী ঋণ উচ্চাভিলাষী মাত্রায় বাড়লে ২০২৩ সালে তা ৮০ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। 

চিন্তার সরলীকরণের কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ আর বাস্তবতার বিস্তর ফারাক তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ গভর্নর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থনীতির নানা পূর্বাভাস ও প্রক্ষেপণ দেয়ার সময় আমাদের নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলো দায়সারা কাজ করে। তারা সরকারের মনোভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পূর্বাভাস দেয়। এ কারণে পূর্বাভাস ও বাস্তবতার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। দুই বছর আগে বিদেশী ঋণ ও রিজার্ভ নিয়ে পূর্বাভাস দেয়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের চিন্তার সরলীকরণ ঘটেছিল। ওই সময় চ্যালেঞ্জগুলোকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এ কারণে কোনো হিসাব মেলানো সম্ভব হচ্ছে না।’

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অত্যন্ত নাজুক। সামান্য অভিঘাতেই এটি ভেঙে পড়েছে। দুই বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছিলেন, দেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটের অভ্যন্তরীণ কারণই বেশি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা বলে আসছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বহিস্থ কারণে অর্থনীতি সংকটে পড়েছে। এতদিন পর এসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও বলা হচ্ছে, অর্থনীতিতে ভেতরের সমস্যা বেশি। চিন্তার এ পরিবর্তন আগে হলে অর্থনীতি এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতো না।’

সরকারি অন্যান্য মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ এসেছে। যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ এসেছে রাশিয়া থেকে। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়া হয়েছে চীন থেকে। আর রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা ভারত থেকে নেয়া হয়েছে। এছাড়া মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্প ঘিরে জাপান থেকে ৪৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা মূল্যের ঋণসহায়তা নেয়া হচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে সরকার ও সরকারি সংস্থা। বিভিন্ন দেশ ও বহুজাতিক সংস্থা থেকে নেয়া ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগ হয়েছে। বাকি ২২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত। সরকারি-বেসরকারি বিদেশী ঋণের বর্তমান স্থিতি দেশের মোট জিডিপির ২১ দশমিক ৮ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মোট বিদেশী ঋণের মধ্যে ৮২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারই দীর্ঘমেয়াদি। আর ১৬ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার স্বল্পমেয়াদি। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে বিদেশী উৎস থেকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৩৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার ছিল দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। বাকি ৬ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ ছিল স্বল্পমেয়াদি। ওই অর্থবছরে বিদেশী ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ওই সময় বিদেশী ঋণ ছিল দেশের মোট জিডিপির ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এর পর থেকে বিদেশী ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে উচ্চহারে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এটি ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশী ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৯ শতাংশে। 

সরকারের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ বেড়েছে দ্রুতগতিতে। ২০১৭ সালেও দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরে বেসরকারি খাতে বিদেশী এ ঋণের পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। তবে এর পর থেকে পরিশোধের চাপে বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি কমেছে। চলতি বছরের জুনে এসে এ ঋণের স্থিতি ২২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, গত দুই-তিন বছরে বিশ্বে অপ্রত্যাশিত বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে। কভিড শুরুর আগে কেউ ভাবেনি মহামারীর কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এতটা স্থবির হয়ে যেতে পারে। আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম যেভাবে বেড়ে গিয়েছিল, সেটিও ছিল ভাবনার বাইরে। এসব কারণে পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশের অর্থনীতি এগোয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব পূর্বাভাস দেয়ার আগে আরেকটু দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারত। কারণ যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাস অর্থনীতির নীতি প্রণয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

বিদেশী ঋণ প্রক্ষেপণের তুলনায় অনেক বেড়ে গেলেও রিজার্ভের ক্ষেত্রে বিপরীতটি ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রকাশনায় বলা হয়েছিল, ২০২২ ও ২০২৩ সালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ১০ বিলিয়ন ডলার করে যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে ২০২৩ সাল শেষে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সে প্রক্ষেপণ বাস্তব রূপ পায়নি। উল্টো ক্ষয় হতে হতে রিজার্ভ এখন ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে।