বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বদলে যাচ্ছে দেশের ঋতুচক্র। দেখা দিচ্ছে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষিতে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমন উৎপাদনে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

জলবায়ুর এ পরিবর্তনে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় আমন চাল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গত তিন বছরের ব্যবধানে উপকূলীয় এ জেলায় আমন চাল উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ হাজার টন।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাতক্ষীরায় দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এতে ক্রমেই আমন চালের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দ্রুত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিতে সামনের কাতারে রয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ জেলায় রোপা আমন চাল উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬ টন, এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২০-২১ উৎপাদন হয় ২ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ এবং চলতি ২০২১-২২ মৌসুমে জেলায় সরকারিভাবে আমন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭২৮ টন। এ হিসাব অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা পুরো অর্জিত হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় ২৮ হাজার ৩৫৮ টন উৎপাদন কমে গেছে।

ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, সাতক্ষীরায় দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও অফিস প্রধান ড. এসএম মফিজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, উপকূলীয় এ জেলাতে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এর ফলে বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে চালের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। শুধু চালই নয় অন্যান্য ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, চলতি শুষ্ক মৌসুমেও জেলার একটি বড় অংশ জলাবদ্ধতার কারণে পানির নিচে ডুবে আছে। এ জলাবদ্ধতা থেকে ফসলি জমি রক্ষা করতে হলে বেতনা, মরিচ্চাপ ও কপোতাক্ষ নদ-নদী খননের কোনো বিকল্প নেই।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাটকেখালী গ্রামের কৃষক সাদেক আলী জানান, চলতি রোপা আমন মৌসুমে ছয় বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ জাতের ধান চাষ করেছেন। কিন্তু বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ করেছেন দুই দফা। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরু থেকে প্রথমবার বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ করার পর কয়েক দফায় অতিবৃষ্টিতে ধানের চারা পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। এরপর পানি কমে গেলে দ্বিতীয়বার বীজতলা তৈরি করে চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় চারা রোপণ করা হলেও ফলন খুব একটা ভালো হয়নি। তিনি বলেন, তিন-চারদিন হয়েছে ধান কাটা শুরু করেছেন। কিন্তু ধানের যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে বিঘায় ১০-১২ বস্তার বেশি হবে না। কৃষক সাদেক হোসেন আরো বলেন, গত বছর একই ব্রি-২৮ জাতের ধান বিঘাপ্রতি ১৫-১৬ বস্তা পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছিল। তার মতো একই অবস্থা বাটকেখালী গ্রামের অধিকাংশ কৃষকের। তারা বলেন, অসময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ফসলহানি ঘটছে তাদের।

সদর উপজেলার কুখরালী গ্রামের কৃষক তুহিনুর রহমান তুহিন জানান, চলতি মৌসুমে চার বিঘা জমিতে হাইব্রিড ধানী গোল্ড জাতের ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার কমপক্ষে ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলার আইলাদুর্গত গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম মাকসুদুল আলম জানান, তার ১০ বিঘা ধানের জমিতে কয়েক বছর ধরে কোনো ফসল হয় না। অথচ এক দশক আগেও ওই জমিতে প্রচুর পরিমাণ আমন ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে জমিতে অতিমাত্রায় লবণাক্ততা দেখা দেয়ায় সেখানে এখন কোনো ফসল হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে ফসলি জমিতে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। একই অবস্থা তার ইউনিয়নের অন্তত ৯০ শতাংশ কৃষকের। যারা এখন চিংড়ি চাষের জন্য এসব ফসলি জমি লিজ দিয়ে রেখেছেন বা নিজেরাই চিংড়ি চাষ করছেন।

উপকূলীয় আশাশুনি উপজেলার কুড়িকাউনিয়া গ্রামের কৃষক ইয়াহিয়া হোসেন জানান, তার ১৫ বিঘা জমিতে বছরে একটি করে ফসল শুধু রোপা আমন চাষ হতো। কিন্তু অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে পাঁচ-ছয় বছর ধরে ফসল হয় না। সেখানে এখন চিংড়ি মাছের ঘের করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুল ইসলাম জানান, জলাবদ্ধতাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চাল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতি বছর এ জেলায় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়সহ অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। এতে করে ফসলি জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা বা খরা। ফলে ক্রমান্বয়ে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তর সাতক্ষীরা জেলার সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যে ক’টি ঝুঁকিপূর্ণ জেলা, তার মধ্যে অন্যতম সাতক্ষীরা। এখানে অতিদ্রুত জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে খাদ্যশস্য উৎপাদনে। ফসলি জমিতে অতিমাত্রায় লবণাক্ততার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ও কখনো কখনো খরা দেখা দিচ্ছে। এতে করে ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

সরদার শরিফুল ইসলাম আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে হলে নদী খননের পাশাপাশি বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। বিশেষ করে সুন্দরবনের কিছু গাছ যেমন—বাইন, কেওড়া বা গেউয়া রোপণ করতে হবে। এসব গাছ মিঠাপানির এলাকায় যেমন বাঁচে, তেমনি লবণসহিষ্ণু।