ঢাকা ওয়াসার পুরনো মানচিত্রে রাজধানীর শাহবাগ থেকে মগবাজার পর্যন্ত ছিল পরীবাগ খাল। এখন সেখানে খালের কোনো চিহ্ন নেই। ঢাকার বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া খালের মধ্যে অন্যতম এটি। এভাবে সময়ের সঙ্গে ঢাকার মানচিত্র থেকে বিলীন হয়েছে অন্তত ১২টি খাল। দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে খালের সংখ্যা ৪১টি। নানা দূষণ-দখলের মধ্যেও টিকে রয়েছে এ খালগুলো। যদিও বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি সংস্থার দেয়া তথ্যে এ সংখ্যায় গরমিল পাওয়া যায়। ফলে ঠিক কতটি খাল, কত সময়ের মধ্যে বিলীন হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা পাওয়া মুশকিল। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় পরীবাগ খালসহ ১২টি খাল বিলীন হওয়ার স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়।

কেবল পরীবাগ খালই নয় ধোলাইখাল-১ দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু থেকে উত্পত্তি হয়ে ধোলাইখাল-২ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, ধোলাইখাল-২ বুড়িগঙ্গার নদী থেকে উত্পত্তি হয়ে সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, দয়াগঞ্জ, ওয়ারী হয়ে দয়াগঞ্জ বাজার পর্যন্ত ছিল। এ খাল দুটির একটি অংশ পুরান ঢাকার বেগমগঞ্জ, রায়সাহেব বাজার ও বাবুবাজার দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে মিলেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সূত্রমতে, একসময় সাত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ধোলাইখাল এখন ৯০০ মিটারে এসে ঠেকেছে। সিটি করপোরেশনের ৪১ খালের তালিকায় এটি থাকলেও আদতে ধোলাইখাল এখন কেবলই ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ সরু ডোবা। যেটিকে খাল বলে চেনার আর কোনো উপায়ই নেই।


হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় রয়েছে রায়েরবাজার খাল। এটি সুলতানগঞ্জ থেকে রায়েরবাজার পর্যন্ত প্রবাহিত ছিল। বিজয়নগর পানির ট্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত আরামবাগ খাল এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গোপীবাগ পর্যন্ত ছিল গোপীবাগ খাল। সেখানে এখন বক্সকালভার্ট নির্মাণ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বক্সকালভার্টের মাধ্যমে সেগুনবাগিচা খালকেও মেরে ফেলা হয়েছে। বাউথার হয়ে বালু নদী পর্যন্ত প্রবাহিত ছিল গোবিন্দপুর খাল, কলাবাগান হয়ে হাতিরঝিল পর্যন্ত প্রবাহিত ছিল কাঁঠালবাগান খাল, নারিন্দা থেকে ধোলাইখাল পর্যন্ত নারিন্দা খাল এবং পান্থপথ থেকে বেগুনবাড়ী পর্যন্ত পান্থপথ খালের অস্তিত্বও বিলুপ্ত হয়েছে কালভার্ট নির্মাণের ফলে। দয়াগঞ্জ থেকে ডিএনডি নিম্নাঞ্চল পর্যন্ত ধলপুর খালটির এখন আর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

স্থানীয়রা বলছেন, চোখের সামনেই এ খালগুলো দখল হয়ে বিলীন হয়ে যেতে দেখেছেন তারা। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হলে পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন ভবন-স্থাপনা। যার ফলে দখলে-অনিয়মে হারিয়ে যায় এসব খাল। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে ঢাকার জনসংখ্যা। বাড়তি মানুষের চাপ সামাল দিতে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন অবকাঠামো। এর চাপে বিলুপ্ত হয়েছে একের পর এক খাল।

এমনকি রাজধানীর বুকে যে খালগুলো এখন টিকে আছে, সেগুলোর অস্তিত্বও হুমকির মুখে। নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কের পাশে বয়ে চলা কাজলা-কুতুবখালী খালের অবস্থা ভয়াবহ সংকটাপন্ন। একই অবস্থা জিয়া সরণি ও শ্যামপুর খালেরও। সরেজমিন দেখা যায়, স্থানীয়রা খালগুলোকে আবর্জনার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করছেন। খালের দায়িত্ব পাওয়ার পর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে একাধিকবার পরিষ্কার করা হলেও খালগুলো দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এমনও দেখা গেছে, সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পর পরই আবার সেগুলো দখল শুরু হয়ে গেছে। স্থানীয়দের সচেতনতার অভাবে দীর্ঘসময় দূষণমুক্তও রাখা সম্ভব হয় না এসব খাল।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খালগুলো ব্যবহার উপযোগী করার মাধ্যমে যেন স্থানীয়দের কাজে লাগে সে ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে এগুলোর বিষয়ে যত্নশীল হবেন তারা। ঢাকার যানজটের কথা মাথায় রেখে খালগুলোকে যোগাযোগের পথ হিসেবে ব্যবহার করা গেলে সেটি হবে সবার জন্য প্রয়োজনীয়। এক্ষেত্রে হাতিরঝিল ব্যবহার করে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণের কথা বলেন তারা।

এ বিষয়ে নগরবিদ ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, যে খালগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলো রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে দুই সিটিকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে খালগুলো উদ্ধার করে এগুলোর মাধ্যমে নৌপথে যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এছাড়া খাল টিকিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই।

১২টি খাল বিলীন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও এ মুহূর্তে ঢাকায় খালের সংখ্যা ঠিক কতটি তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার জরিপে এ বিষয়ে আলাদা তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে ঢাকার খাল নিয়ে একটি জরিপ করে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)। সেখানে ঢাকা সিটির ৩৮ খালের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। তবে ২০২০ সালের আরেক জরিপে সংস্থাটি জানায়, ঢাকায় নদীর সঙ্গে সংযুক্ত নামে-বেনামে ৭০টির বেশি খাল রয়েছে।

অন্যদিকে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় খালের সংখ্যা ৫০। এর ওপর ভিত্তি করে ঢাকার খাল নিয়ে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) একটি রিট করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার ৫০টি খাল দখলমুক্ত করতে নির্দেশ দেন আদালত।

আরডিআরসি ও আইডব্লিউএমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে রাজধানীতে ৫৩টি খাল সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। তবে দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, ঢাকায় খালের সংখ্যা বর্তমানে ৪১টি।

খালের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে মতবিরোধের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সত্যি বলতে এখনো অনেক খালের অস্তিত্ব সম্পর্কে তারা নিজেরাও জানেন না। তবে খাল উদ্ধার ও পরিচ্ছন্নের ব্যাপারে সিটি করপোরেশন বদ্ধপরিকর। এ দুই কর্মকর্তা বলেন, যে খালগুলো হারিয়ে গেছে, সেগুলো রেখেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা সম্ভব ছিল। এখন যে খালগুলো টিকে আছে, সেগুলো যেন হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে সিটি করপোরেশন সব রকমের কাজ করে যাচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা খাল উদ্ধারে চেষ্টা করে যাচ্ছি। গত দুই বছরের প্রচেষ্টার ফলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে। খালগুলো ঘিরে বড় পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, আর কোনো খাল বিলুপ্ত হবে না।