গাজীপুরের বলধার জমিদার ছিলেন নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী। শখের বশে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানারকম বৃক্ষ এনে তিনি জড়ো করেন রাজধানীর ওয়ারীতে। তার সেই সংগ্রহশালাই আজকের বলধা গার্ডেন। ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী এ বাগান পুরান ঢাকাবাসীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। কিন্তু গত চার বছর চাহিদামতো পানি পাচ্ছে না বাগান কর্তৃপক্ষ। এতে সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে বাগানের জীববৈচিত্র্য। ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষকে (ঢাকা ওয়াসা) বারবার চিঠি দিয়েও মিলছে না কোনো সমাধান।
জানা গেছে, ১ দশমিক ৩৭ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত বলধা গার্ডেনে চার বছরের বেশি সময় ধরে পানি সরবরাহ করতে পারছে না ঢাকা ওয়াসা। ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে এ উদ্যানের ৮০০ প্রজাতির প্রায় ১৮ হাজার উদ্ভিদ। পানির পাম্প পুরনো হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন ধরে এক জায়গা থেকে পানি তোলার কারণে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াসার একটি সূত্র। সম্প্রতি ওয়াসার একজন প্রকৌশলীও সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন গার্ডেন। কিন্তু পানি সংকটের বিষয়ে কোনো সমাধান মেলেনি বলে জানিয়েছে গার্ডেন কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন দেখা যায়, বলধা গার্ডেনের বেশির ভাগ পানির হাউজ খালি। ভর্তি হাউজগুলোর পানি ঘোলাটে। পুকুরে থাকা পানিও নোংরা। সেখানে মাছের চাঞ্চল্য নেই বললেই চলে। এমনকি দর্শনার্থীদের জন্য গার্ডেনের ভেতরে যে টয়লেট আছে, সেখানেও পানি নেই। ওয়ারীর বাসিন্দা আসিফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বলধা গার্ডেন শুধু পুরনো বাগানই নয়, দেশের ঐতিহ্যের মূল্যবান নিদর্শনও। এটি ঢাকার ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিত। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে কোনো বিদেশী পর্যটক এলে তাদের তালিকায় ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের নামটিও থাকত। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্যান শুধু পানির অভাবে নষ্ট হয়ে যাবে, তা মেনে নেয়া যায় না। এ ব্যাপারে সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে।
গার্ডেন সূত্র জানায়, বলধা গার্ডেনের ভেতরে পানির পাম্প স্থাপনের জন্য প্রায় ১২০০ বর্গফুট স্থান নির্ধারণ করে দেয়া হয় ঢাকা ওয়াসাকে। ১৯৮১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিতে শর্ত ছিল, ওয়াসা প্রতিদিন ১০ হাজার গ্যালন পানি দেবে গার্ডেনে। আর সে পানিই দেয়া হয় গার্ডেনে থাকা গাছপালায়। কিন্তু চার বছরের বেশি সময় ধরে বলধা গার্ডেনে পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না ওয়াসা। এতে গাছপালায় পানি দেয়া নিয়ে বিপত্তির মধ্যে পড়ে গার্ডেন কর্তৃপক্ষ। পানি সরবরাহ চালু রাখতে বারবার চিঠি দিয়েও সমাধান হয়নি বলে জানান তারা।
বলধা গার্ডেনের তত্ত্বাবধায়ক অহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বিরল প্রজাতিসহ নানা জাতের উদ্ভিদ গার্ডেনে আছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য আমরা বিকল্প পদ্ধতিতে গাছে পানি দিচ্ছি। কিন্তু যথেষ্ট পানি দিতে পারছি না।
তবে পানি সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করে গার্ডেন কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে ওয়াসা। ওয়াসা মডস জোন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, পানি সংকটের বিষয়টি সঠিক নয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে পানি কম উঠছে। আবার গার্ডেন কর্তৃপক্ষ যে পদ্ধতিতে পানি নিচ্ছে, সে কারণেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
একে তো পানির স্তর অনেক নিচে, তার ওপর গ্রীষ্মকালে পানির চাপ কম থাকে। গার্ডেন কর্তৃপক্ষ লাইন থেকে সরাসরি বাগানে পানি দিচ্ছে। তাতেই পানির পর্যাপ্ত চাপ পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছে ওয়াসা। তিনি বলেন, নিয়ম হলো লাইন থেকে পানি ট্যাংক বা জলাধারে সংরক্ষণ করে বাগানে পানি দেবে। সেটা করা হচ্ছে না বলেই গত কয়েক বছর পানির চাপ কম হচ্ছে। এ পাম্প থেকে আগে প্রতি ঘণ্টায় তিন হাজার লিটার পানি তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন ৬০০ লিটারের বেশি পানি তোলা যাচ্ছে না। এ কারণেও সংকট দেখা দিয়েছে।
সমাধানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরনো পাম্পটি সরিয়ে নতুন পাম্প বসাতে পারলে এ সংকট সমাধান করা সম্ভব। নতুন পাম্প বসাতে হলে যন্ত্রপাতি ও পাম্প স্থাপনের জন্য জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষ সেটি দিচ্ছে না। আমরা তাদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছি, পাম্প স্থাপন কাজের জন্য বর্তমান জায়গার পাশে অতিরিক্ত জায়গা সাময়িকভাবে বরাদ্দ দিতে। পাম্প স্থাপন কাজ শেষ হলে জায়গা ছেড়ে দেব। কিন্তু এখনো আমরা সে বিষয়ে কোনো সমাধান পাইনি।










