রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে নিয়ম মেনে নকশা অনুমোদনের পর সেটির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের নজির অহরহ। এক্ষেত্রে অবশ্য সংস্থাটির পরিদর্শকদের গাফিলতিই বড় দায়ী। তবে এবার নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত ও নির্মাণাধীন ভবনের তালিকা করবে রাজউক। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকদেরও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংস্থাটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা।
রাজউকের একাধিক পরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর ৯৫ শতাংশ ভবনই অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত। এক্ষেত্রে পরিদর্শকদের গাফিলতি থাকলেও প্রভাবশালীদের হুমকি-ধমকিও দায়ী বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ওয়ারী জোনের একজন পরিদর্শক বণিক বার্তাকে বলেন, রাস্তার একাংশ দখল করে আমার সামনেই তিনটি ভবন গড়ে উঠছে। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছি না। একবার চিঠি দিয়েছিলাম। এরপর নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই এলাকায় আর ঢুকতে পারিনি। ওই পরিদর্শক আরো বলেন, আমরা যখন পরিদর্শনে যাই সঙ্গে কোনো পুলিশ থাকে না। অন্যদিকে যারা ভবন মালিক তারা ব্যাপক প্রভাবশালী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের বাধা দেয়া সম্ভব হয় না।
গেন্ডারিয়া এলাকার সাবেক এক পরিদর্শক বলেন, রাজউকে অধিগ্রহণভুক্ত একটি পুকুর আছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-৩০ (ড্যাপ)-এ সেটিকে জলাধার হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেই পুকুরটি দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা দোকানপাট নির্মাণ করে রেখেছে। তাই পুকুরটি দখল উচ্ছেদের সুপারিশ করি। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় গেলেই প্রভাবশালীরা নানা হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। একটা সময় সেখানে যাওয়াই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই।
আবার ভিন্ন চিত্রও আছে। একাধিক ভবন মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিয়ম মেনে রাজউকের কোনো কাজই করা যায় না। তবে ঘুস দিলে সব হয়ে যায়। ভবন বানানোর সময় থেকেই পরিদর্শকরা ঘুরতে থাকেন টাকা খাওয়ার জন্য। ঘুস দেয়ার আগ পর্যন্ত তারা নানা আইন আর নিয়ম দেখান, আর টাকা দিলে সব অনিয়ম শুদ্ধ হয়ে যায়! এমনকি তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে বাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠান বন্ধের হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এমন পরিস্থিতিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের উপস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার রাজউক কার্যালয়ে একটি সভা হয়। সেখানে রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা ঘোষণা দেন, সংস্থার আওতাধীন এলাকায় যেসব ভবন নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মাণ হয়েছে সেগুলোর একটি তালিকা প্রণয়ন করা হবে। সেই সঙ্গে ভবনগুলোর এ অনিয়মের ক্ষেত্রে পরিদর্শকদের গাফিলতি আছে কিনা তা যাচাই করা হবে। যদি পরিদর্শকদের অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, তখন বিধিমালা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মবহির্ভূত ভবনের লাগাম ধরতে রাজউকের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। আরো আগেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরাও। এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি, রাজউককে জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। নিয়মের ব্যত্যয় করে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কেবল পরিদর্শকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনলেই চলবে না, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে যারা জেনেশুনে অনিয়ম করেছেন, যারা প্রভাব খাটিয়েছেন তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমান মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের পরিদর্শকরা নানা অজুহাত দেখিয়ে বলেন, চিঠি দেয়ার পরও ভবন মালিকরা অনিয়ম বন্ধ করছেন না। অনেক সময় তারা কাজ বন্ধ করে দিয়ে আসার পর আবার শুরু করে দেয়া হয় বলেও পরিদর্শকরা অপারগতা দেখাচ্ছেন। তাই এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি ও আমাদের মনিটরিং টিম বেশি বেশি করে এখন থেকে বাইরে যাব। পরিদর্শকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্যই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি এ উদ্যোগও নিচ্ছি, যেসব ভবন একেবারেই নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ হয়েছে, সেগুলো ভেঙে ফেলা হবে। আর এসব ক্ষেত্রে যদি কোনো পরিদর্শকের অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি মেনে অ্যাকশনে যাব।










