যশোরের ভৈরব নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নওয়াপাড়া বন্দর। এখান থেকে সারা দেশে সরবরাহ হয় কয়লা, পাথর, সার ও খাদ্যশস্য। তবে নাব্য সংকটে ক্রমেই সরু হয়ে পড়ছে নৌ-চ্যানেলটি। এ কারণে নওয়াপাড়া বন্দরে বাড়ছে পণ্যবাহী জাহাজজট। অপেক্ষমাণ জাহাজ ভেড়ার জন্য অপ্রতুল ঘাটও নেই সেখানে। ভাটার সময় নদে পানি কমে গেলে জাহাজের তলা মাটিতে মিশে যায়। অনেক সময় জাহাজ কাত হয়ে পড়ে। তলা ফেটে জাহাজডুবির ঘটনাও ঘটছে। এক দশকে ভৈরব নদে অর্ধশতাধিক জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানি না হলেও ক্ষতি হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অব্যাহত দখল-দূষণ, অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও সেতু নির্মাণ এবং ঘাট মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় নদটি এখন মৃতপ্রায়। তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে আসছে। নদের দুই তীরেই চর জাগতে শুরু করেছে। নাব্য সংকট, সরু চ্যানেল এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ জেটি না থাকা—এ তিন কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে নওয়াপাড়া নদীবন্দর। ভাটার সময় নদের পানি কমে গেলে জাহাজের তলা মাটিতে মিশে যায়। ফলে অনেক সময় জাহাজ কাত হয়ে পড়ে এবং তলায় ফাটল দেখা দেয়।
অভয়নগর উপজেলা শহর নওয়াপাড়ার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদ এবং যশোর-খুলনা রেলপথ ও মহাসড়ক। এ তিন পথ নওয়াপাড়ায় সমান্তরালে ১৫০-২০০ মিটার দূরত্বে রয়েছে। তিন পথের যোগাযোগ সুবিধার কারণে নওয়াপাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরে বিদেশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানি পণ্য এখানে খালাস হয়। এখান থেকে সারা দেশে যায় রাসায়নিক সার, কয়লা, খাদ্যশস্য ও পাথর। শুধু আমদানি পণ্য নয়, প্রায় হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ পণ্যের বড় বাজার নওয়াপাড়া।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় নওয়াপাড়া নোনা ঘাটে এমভি সাকিব বিভা-২ নামে একটি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। এতে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কয়লা ছিল। মোংলা বন্দরের হাড়বাড়িয়া থেকে ৬৮৫ টন কয়লা নিয়ে জাহাজটি এসেছিল। নোঙরের জন্য ঘোরানোর সময় মাটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে তলা ফেটে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এর আগে ৪ জানুয়ারি ভাটপাড়ায় ভৈরব নদের ঘাটে ৮০০ টন কয়লা নিয়ে এমভি পূর্বাঞ্চল-৭ নামে আরেকটি জাহাজ ডুবে যায়। ভাটার সময় জাহাজটি কাত হয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে সেটি তলিয়ে যায়।
আমদানিকারকরা জানান, নওয়াপাড়া বন্দরে জাহাজজটের চিত্র নিত্যদিনের। ঘাটে নোঙরের অপেক্ষায় থাকতে হয় ১০-১৫ দিন। অপেক্ষমাণ জাহাজ ভেড়ার জন্য অপ্রতুল ঘাট, আর নাব্য সংকটের কারণে মোংলা বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজগুলোর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বন্দর উন্নয়নে বারবার দাবি জানানো হলেও তাতে কর্ণপাত করছেন না সংশ্লিষ্টরা।
সার ও খাদ্যশস্য আমদানিকারক আদিত্য মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঘাট সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। নিজেরাই ঘাট তৈরি করে নিচ্ছি। পণ্যবোঝাই জাহাজের হার বাড়লেও বন্দরের উন্নয়ন হচ্ছে না। শুধু ট্যাক্স দিয়েই যাচ্ছি। কোনো সুবিধা পাচ্ছি না।’
নওয়াপাড়া সার ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল হোসেন বলেন, ‘ভৈরব নদকে ঘিরে নওয়াপাড়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। আমরা ঠিকমতো ট্যাক্স দিচ্ছি। কিন্তু নদী বন্দরের কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। এখানে ছোট জাহাজ এলেও ঘাটে ভিড়তে পারে না। এজন্য আমরা গাইড ওয়াল নির্মাণের দাবি করেছিলাম। কিন্তু তা করা হয়নি।’
খুলনা নৌ-পরিবহন মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ চৌধুরী মিনহাজ উজ জামান সজল বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব থেকে বড় নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র নওয়াপাড়া বন্দরের এ অবস্থা দীর্ঘদিনের। নাব্য সংকট ও পানি কমতে কমতে ভৈরব নদ ছোট হয়ে আসছে। সঠিক পদ্ধতিতে ড্রেজিং করার প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা বারবার বলেছি। তবে এর সমাধান হচ্ছে না।’
তবে বন্দরের উন্নয়নে কিছু পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মাসুদ পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নওয়াপাড়া নদীবন্দরটি নিয়ে সরকার অনেক কাজ করেছে। সামনে আমাদের বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন হলে আরো বেশি জাহাজ ভিড়তে পারবে। এর পরও প্রতি বছর আমাদের এখানে পণ্যবাহী জাহাজের হার বেড়েছে। আমাদের রাজস্ব আহরণও বেড়েছে।’
এ বিষয়ে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক বাবুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নওয়াপাড়া নৌবন্দরের সমস্যা সমাধানে ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে পাসের অপেক্ষায়। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে এখানে খননকাজের পাশাপাশি একটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। যাতে ব্যবসায়ীরা সেখানে নিরাপদে পণ্য রাখতে পারেন। তখন অনেকটা স্বস্তি পাবেন ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য কার্যক্রমও বাড়বে।’
তবে নৌবন্দরের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নৌবন্দরে ১ হাজার ৬১৩টি জাহাজে ৭ লাখ ৬ হাজার ৮১৩ টন পণ্য এসেছে। এ থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ২ কোটি ৬৫ লাখ ৮৯ হাজার ১৮৬ টাকা। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৮৪টি জাহাজে পণ্য এসেছে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৩১৩ টন পণ্য। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৭৫টি জাহাজে পণ্য এসেছে ৫ লাখ ৯০ হাজার ২২০ টন এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ২০৫টি জাহাজে এসেছে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০ টন পণ্য।










