সিরাজগঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি বছর মে মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬ জন। তাদের বেশির ভাগই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে পাচ্ছেন না জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন। অনেকেই বাইরে থেকে বেশি দামে ভ্যাকসিন কিনে আনছেন। কেউ কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
চিকিৎসকরা বলছেন, কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি, বানর ইত্যাদি প্রাণী জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এবং আক্রান্ত প্রাণীটি সুস্থ মানুষ বা গবাদিপশুকে কামড়ালে ওই মানুষ কিংবা গবাদিপশু এ রোগে আক্রান্ত হয়। তবে আমাদের দেশে ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগ হয় কুকুরের কামড়ে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এ রোগে মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে। জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকাও রয়েছে, যা রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগেই শরীরে প্রয়োগ করতে পারলে মৃত্যু এড়ানো যায়। সরবরাহ না থাকায় মাসখানেক হলো ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ শুরু হবে সেটাও বলা যাচ্ছে না।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচির রেজাউল করিমকে (১৯) বাড়ির সামনে থেকে কুকুরে কামড়ে দেয়। স্থানীয় চিকিৎসককে দেখালে ভ্যাকসিন নেয়ার পরামর্শ দেন। পরে তিনি সিরাজগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। প্রথমে কী করবেন বুঝতে পারেননি। সে সময় আরো অন্তত ২০ জনকে ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখেন। প্রত্যেকে ১৩০ টাকা করে দিয়ে তারা চারজনে বাইরে থেকে ভ্যাকসিন নিচ্ছেন।
রেজাউল করিম জানান, ৩০ মে প্রথম ডোজ, ৪ জুলাই দ্বিতীয় এবং ৭ জুলাই শেষ ডোজ নিয়েছেন। সব ভ্যাকসিন তাকে বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। শুধু তিনিই নন, এমন সমস্যায় পড়েছেন জেলার শত শত রোগী।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আক্রান্তদের ভ্যাকসিন ক্রয় করে দিতে হচ্ছে। এজন্য বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এ কারণে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন আক্রান্তরা।
সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের মালসাপাড়া মহল্লার ফাতেমা বেগম জানান, তার তিন বছর বয়সী নাতনিকে বিড়ালে আঁচড় দিলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে জানতে পারেন ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ। অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে তিনবারে তিনটি ভ্যাকসিন দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে ৪০০-৫০০ টাকা খরচ করে ভ্যাকসিন দেয়া কঠিন। তারপরও উপায় না পেয়ে দিতে হয়েছে।’
সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছর এপ্রিলে প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৪১৮ জন। এর মধ্যে কুকুর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন ২২৩ জন। ওই মাসে ভ্যাকসিন মজুদের ওপর নির্ভর করে প্রথম ডোজ দেয়া হয় ৪১৮টি, দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয় ৩১৭টি এবং তৃতীয় ডোজ দেয়া হয় ২৮৩টি। মে মাসে আক্রান্তের হার বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ওই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬ জন। এর মধ্যে কুকুর দ্বারা আক্রান্ত হন ৪২৯ জন। রোগীদের ক্রয় করে নিয়ে আসা প্রথম ডোজ দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৬টি। দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়েছে ৯৮১ এবং তৃতীয় ডোজ দেয়া হয়েছে ৯৬০টি। এরপর ভ্যাকসিনের মজুদ পুরোপুরি ফুরিয়ে গেছে। জুন থেকে সরকারিভাবে আর ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে না। যদিও গত দুই মাসে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় রোগীদের ক্রয় করে ভ্যাকসিন দিতে হয়েছে।
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আকিকুন নাহার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস র্যাবিশ ভ্যাক (জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন) সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রাণীর দ্বারা আক্রান্তরা ভ্যাকসিন নিতে না পারলে কিছুটা স্বাস্থ্যঝুঁকি তো থেকেই যায়। তবে আমরা রোগীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে ক্যাম্প বন্ধ করে দিইনি। ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় জনবল দিয়ে রাখা হয়েছে, যেন বাইরে থেকে ক্রয় করে হলেও রোগী সঠিকভাবে ভ্যাকসিন নিতে পারেন। সরবরাহ সংকটের বিষয়ে আমরা যোগাযোগ করছি। দ্রুতই ভ্যাকসিন সরবরাহ হবে বলে আশা করছি।’










