এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের সাবেক কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরীর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পর বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন ওই আদেশ দেন।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর শুনানিতে অংশ নেন। আদালতের নির্দেশনায় ওই কমিশনারকে বিদেশ ভ্রমণে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. শাহআলম শেখ।

দুদক সূত্র জানায়, ওয়াহিদা রহমানের দেশত্যাগ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আজ ইমিগ্রেশনে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদেশের অনুলিপি সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন), স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশসহ বেশ কয়েকটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হয়েছে।

গত ১১ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) সাবেক ভ্যাট কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরীর নামে মামলা দায়ের করে দুদক। মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও এয়ারটেল লিমিটেডকে ১৫৩ কোটি টাকার অবৈধ সুবিধা দেয়ার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. শাহআলম শেখ বাদী হয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে (ঢাকা-১) মামলাটি দায়ের করেন।  

এজাহারে অভিযোগ আনা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইন বহির্ভূতভাবে ওয়াহিদা রহমান চৌধুরীর একক নির্বাহী সিদ্ধান্তে ১৬টি নথিতে ১৫২ কোটি ৮৯ হাজার ৩৯০ টাকা অপরিশোধিত সুদ মওকুফ করে সরকারের আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়। এনবিআর সদস্য হোসেন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত টিমের প্রতিবেদনেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে।

তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১৮/৪০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি করা হয়। মঙ্গলবার (১১ জুন) দুপুরে দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান।

চার মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনবিআরের আর কেউ মামলার আসামি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে দুদক সচিব বলেন, ‘তদন্ত পর্যায়ে অন্য কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হবে।’

ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী দেশের বাইরে নাকি দেশে রয়েছেন, বণিক বার্তা প্রতিবেদকের এ প্রশ্নে দুদক সচিব কোনো উত্তর দেননি। তবে দুদকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তিনি দেশেই রয়েছেন। চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। তার বয়স এখন ৬০।’

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, তিনি ২০২৩ সালের অক্টোবরে অবসরে যান। এলটিইউর আগে তিনি শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরে (ডেডো) কমিশনার পদে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

দুদকের অভিযোগের বিষয়ে ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি সারা জীবন সততার সঙ্গে চাকরি করেছি। দুদক যে বিষয়ে অভিযোগ এনেছে, এর সবই হাইকোর্টে বিচারাধীন।’

এনবিআরের তদন্ত কমিটিও সত্যতা পেয়েছে জানালে তিনি বলেন, ‘তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন। এনবিআরে এখন কে যে কী করছে, আমার জানা নেই। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালে এসব এডিআর হয়েছে। আমার সময়ে নয়।’

আপনি একক নির্বাহী আদেশে মওকুফ করে দিয়েছেন দুদকের এ অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মওকুফ আবার কী। নোটে একটা বিষয় প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, তারপরই না শাস্তি। এটা তো প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এডিআর একটা শালিস।’

অনুসন্ধান পর্যায়ে দুদক তার কোনো বক্তব্য নেয়নি। কোনো নোটিসও দেয়নি বলে অভিযোগ ওয়াহিদা রহমান চৌধুরীর।

মামলার এজাহারে আরো বলা হয়, চারটি প্রতিষ্ঠানের স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার ওপর আইনানুগভাবেই ভ্যাট প্রযোজ্য হওয়ায় তা মেনে নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে যথাসময়ে ১৮৯ কোটি ৭৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার কথা বলে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত কর মেয়াদে তা পরিশোধ না করায় মূসক আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে প্রদেয় সুদের পরিমাণ হয় ১৫২ কোটি ৮৯ হাজার ৩৯০ টাকা। মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১ এর ধারা ৩৭(৩) অনুসারে সুদ আদায়ের জন্য কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী অতি দ্রুত সুদের হিসাব করার নির্দেশ প্রদান করেন। সুদ হিসাবে সরকারের পাওনা অর্থের মধ্যে গ্রামীণফোন লিমিটেডের কাছে ৫৮ কোটি ৬৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৯৭ টাকা, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনের কাছে ৫৭ কোটি ৮৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫১ টাকা, রবি আজিয়াটার কাছে ১৪ কোটি ৯৪ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং এয়ারটেল বাংলাদেশের কাছে ২০ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার ৯৫২ টাকা রয়েছে। পরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৩ থেকে ৫ মাস পর ভিন্ন আদেশে ওই সুদ মওকুফ করে দেন ওয়াহিদা রহমান।