চলতি বছরের শুরুটা দেশের পুঁজিবাজারের জন্য ভালো যায়নি। বছরের শুরু থেকেই নিম্নমুখী ছিল বাজার। তার ওপর মার্চে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে পুঁজিবাজারে দরপতন আরো ত্বরান্বিত হয়। বাজারের পতন রোধে একপর্যায়ে শেয়ারের সর্বনিম্ন দর নির্ধারণ করে দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি)। অবশ্য বর্তমানে সে অবস্থা থেকে আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাজার। গত সাত মাসে ডিএসইএক্সে ১ হাজার ৭৪০ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। এক্ষেত্রে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অবদান ছিল ৬৯ শতাংশ।

চলতি বছরের শুরুতে ডিএসইএক্স ছিল ৪ হাজার ৪৫৩ পয়েন্টে। আর ১৮ মার্চ সূচকটি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬০৪ পয়েন্টে। সেখান থেকে সর্বশেষ গতকাল সূচকটির অবস্থান ৫ হাজার ৩৫৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়। এ বছরের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৭৪০ পয়েন্ট বেড়েছে সূচক। এ সময়ে ডিএসইএক্সে রিটার্ন এসেছে ৪৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ কোম্পানির শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ সূচকের উত্থানে এ কোম্পানিগুলোরই অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।

দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে বিভিন্ন খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩২৯। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স হিসাব করা হয় মোট ফ্রি ফ্লোট বাজার মূলধনের ভিত্তিতে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় যে-সংখ্যক শেয়ার ইস্যু করা হয়, সেগুলোই ফ্রি ফ্লোট শেয়ার। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ইস্যু করা শেয়ারের ওপর লকড-ইন পিরিয়ড থাকা পর্যন্ত সেগুলো ফ্রি ফ্লোট শেয়ার হিসেবে গণ্য হয় না। এর বাইরে উদ্যোক্তা-পরিচালক, সরকার ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ারধারীর কাছে থাকা শেয়ারগুলোও ফ্রি ফ্লোট শেয়ার নয়।

করোনকালীন সবচেয়ে বেশি ১১ দশমিক ২ শতাংশ রিটার্ন এসেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারে। শেয়ারের পাশাপাশি কোম্পানিটির ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ২২৫ কোটি টাকা।

করোনাকালে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানিটির বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১১২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ২০৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব এম আসাদ উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমরা কয়েক বছর আগে নুভিস্তা ফার্মাকে অধিগ্রহণ করেছি। এতে আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে। তাছাড়া করোনার চিকিৎসায় ব্যবহূত বেশ কয়েকটি ওষুধ আমরা উৎপাদন ও রফতানি করছি। করোনার ভ্যাকসিন আনার জন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। এ বছর আমরা বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশও বেশি দিয়েছি। অন্যদিকে বেক্সিমকো লিমিটেড করোনার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিপিই ও মাস্ক রফতানি করছে। ৩০ শতাংশ শেয়ারধারণের বাধ্যবাধকতা পূরণে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো লিমিটেডের উদ্যোক্তারা বাজার থেকে বড় অংকের শেয়ার কিনেছেন, যা এ দুই কোম্পানির শেয়ারের মোমেন্টাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কারণেই এ দুই কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে বলে জানান তিনি।

করোনার মধ্যেও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা বিক্রি করেছে কোম্পানিটি। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা।

টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোনের শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ হাজার ৮৬২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে রাজস্ব আয় ছিল ৭ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা।

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা পরিচালন আয় হয়েছে। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে পরিচালন আয় ছিল ১ হাজার ৪১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। করোনার এই সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

তামাক খাতের বহুজাতিক জায়ান্ট ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের (বিএটিবিসি) শেয়ারে করোনাকালীন রিটার্ন এসেছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে কোম্পানিটির। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে রাজস্ব আয় ছিল ১২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংকটির মোট পরিচালন আয় হয়েছে ১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে পরিচালন আয় হয়েছিল ২ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা।

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মোট আয় হয়েছে ৪১ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ।

করোনার এই সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের শেয়ারেও রিটার্নের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২ শতাংশ। এ বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট পরিচালন আয় হয়েছে ১৫৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে পরিচালন আয় হয়েছিল ২০৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালন আয় হয়েছে ৩৫১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে পরিচালন আয় ছিল ৫৬৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ব্যাংকটির শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বছরের মার্চে দেশের পুঁজিবাজার ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গিয়েছিল। বাজারের ধর্মই হলো যে গতিতে পড়ে আবার সে গতিতেই ওঠে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমানে। তাছাড়া বর্তমানে বিনিয়োগের অন্যান্য খাত থেকে রিটার্ন অনেক কমে গেছে। ফলে এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি লাভজনক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই পড়তির দিকে ছিল। সেখান থেকে একসময় বাজার ঘুরে দাঁড়াবে সেটি স্বাভাবিক। বর্তমানে বিনিয়োগের অন্যান্য খাত থেকে রিটার্ন কমে গেছে। পুঁজিবাজারেও অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অলস অর্থ বাজারে আসছে। করোনার সময়ে অবধারিতভাবেই ওষুধ খাতের ব্যবসা ভালো গেছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারে। তবে বেক্সিমকো লিমিটেড ও আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সের তুলনায় শেয়ারের রিটার্ন কিছুটা বেশি ছিল। অবশ্য বাজারে যখন সার্বিক ঊর্ধ্বমুখিতা থাকে তখন বিভিন্ন শেয়ারের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যেতেই পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানামুখী সংস্কারের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থা ফিরে এসেছে। তার মানে সামনের বছরটি আমাদের পুঁজিবাজারের জন্য বেশ ইতিবাচক হবে।