এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ঝুলন্ত ব্রিজ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যেমন সহজ করে, তেমনি ওই এলাকার সৌন্দর্যও বাড়ায়। আর সেটি যদি হয় কোনো জলপ্রপাতকে ঘিরে, তখন পর্যটকও টানে। তবে এসব ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই আগে দেখতে হবে সেটি ওই এলাকার পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কিনা। এজন্য প্রয়োজন সম্ভাব্যতা যাচাই ও সমীক্ষা। সেই সঙ্গে জরুরি ব্রিজের নকশা প্রণয়ন। কিন্তু এসব কোনো কিছু না করেই বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের শৈলপ্রপাতের ওপর পর্যটকদের জন্য একটি ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দরবান-চিম্বুক সড়ক ঘেঁষা শৈলপ্রপাতের পাথুরে ঝিরিতে নামার জন্য বাঁ দিকে বাঁকানো একটি পুরনো পাকা সিঁড়ি রয়েছে। এর মাঝামাঝি অংশ থেকে আরো নিচের দিকে যোগ করা হয়েছে নতুন সিঁড়ি। বাঁকানো এ সিঁড়ির দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১০ ফুট। এর পর পরই ঝিরির দুই পাশে স্থাপন করা হয়েছে দুটি কলাম।

স্থানীয়রা জানায়, শৈলপ্রপাতে মাসখানেক আগে একটি ছোট সিঁড়ি ও দুটি কলামের কাজ শুরু করে উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) অফিস। ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এটি বাস্তবায়ন করছে। বাজেট ৩ লাখ টাকা। তবে সপ্তাহ দুয়েক ধরে শ্রমিক না আসায় অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে কাজটি।

জানা যায়, শৈলপ্রপাতের প্রবহমান পাথুরে উঁচু-নিচু ঝিরির উভয় দিকে দুটি কলাম ও এক পাশে একটি ছোট সিঁড়ি করার পর সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যে স্থানে কলাম স্থাপন করা হয়েছে, অতিবৃষ্টি হলে সেখানকার অর্ধেক পর্যন্ত পানির খরস্রোতের প্রলয় ঢল চলে আসে। এছাড়া অপরিপক্ব প্রকল্পের অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে সম্প্রতি ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণকাজও স্থগিত। তবে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেবেন না বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া আফরোজ।

অফিস সূত্রে জানা যায়, ‘শৈলপ্রপাতে সৌন্দর্যবর্ধন ও ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ’ প্রকল্পটি আগের ইউএনও সাবরিনা সুলতানার সময়ে নেয়া। আর ওই পর্যটন স্পটটি সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের অন্তর্গত। জানতে চাইলে ওই পিআইসির সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য লাল হাই বম বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পের প্রস্তাব আমি দিইনি। ওয়ার্ড পিআইসির সভাপতি হিসেবে আমার নাম বললেও পিআইও অফিসের নিয়ন নামের এক ব্যক্তি কাজটি করছেন। তবে মাত্র ৩ লাখ টাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।

প্রকল্পটি নিজের আমলে নেয়া নয় দাবি করে উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গির আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ঝুলন্ত ব্রিজটির কোনো নকশা নেই। আমরা এখন চেষ্টা করছি, যাতে ভালো কিছু হয়। আপাতত এক পাশে সিঁড়ি আর দুই পাশে কলাম করেছি। ফান্ডও অ্যাভাইলেবল না। এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৬০-৬৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নির্মিত এসব ব্রিজের সম্ভাব্যতা যাচাই হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, এলজিইডির প্রকৌশলী নিয়ে গিয়ে দেখব, পরিবেশের কথা ভেবে আমাদের জন্য কোনটা ভালো হয়। এখনো সিলেক্ট করিনি। তবে আরসিসি করি বা ঝুলন্ত (ব্রিজ), যেটাই করি কলাম লাগবে। আবার যদি করা না লাগে, না করব। সেই টাকায় অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করব।

প্রকৌশল সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, পাথুরে পাহাড়ে সামান্য ভিত্তি দিয়ে ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ করলে ঝুঁকি থেকে যায়। কারণ কী পরিমাণ পর্যটক যাবে, ঝুলন্ত ব্রিজে কী পরিমাণ মানুষ উঠবে-নামবে, স্থানীয়রা কী পরিমাণ পণ্য বা ওজন বহন করে ব্রিজ পারাপার হবে, পরিবেশগত পরিস্থিতি, ব্রিজের নিজস্ব ওজন ও ধারণক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই, সমীক্ষার মাধ্যমে ঝুলন্ত বা আরসিসি ব্রিজের নকশা করা হয়। সে অনুযায়ীই ব্রিজ করা উচিত। অনেকে তো আবার ব্রিজে দাঁড়িয়েও থাকবে, শিশুরা দৌঁড়াবে, লাফ দেবে, এমনকি বয়স্করাও চলাচল করবে।