পোস্তগোলা থেকে কামরাঙ্গীর চর পর্যন্ত ঢাকা নদীবন্দরের অধীন গুদারাঘাট (খেয়াঘাট) রয়েছে ৪৩টি। এসব ঘাটে চলাচল করছে হাজারের বেশি খেয়া ও কয়েকশ ট্রলার। এসব নৌযানে চড়ে প্রতিদিন বুড়িগঙ্গার এপার-ওপার যাতায়াত করছেন কয়েক লাখ মানুষ। নদী পার হতে গিয়ে প্রায়ই তাদের অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নদী পারাপারের জন্য বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। কাগজে-কলমে যাত্রীপ্রতি ২ টাকা করে টোল আদায়ের কথা থাকলেও নেয়া হচ্ছে ৫ টাকা করে। এছাড়াও জীর্ণ অবকাঠামোর কারণে ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ওঠানামা করতে হচ্ছে যাত্রীদের। নদী পারাপার হওয়া যাত্রীদের এসব দুর্ভোগের পেছনে প্রধানত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তদারকির অভাবকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ঢাকা নদীবন্দরের খেয়াঘাট রয়েছে ৪৩টি। ঘাটগুলো বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ ইজারার মাধ্যমে পরিচালনা করছে। পোস্তগোলা থেকে শুরু করে কামরাঙ্গীর চরের আগ পর্যন্ত বিস্তৃত এসব ঘাটে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। খেয়া পারাপারের জন্য বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত ফি রয়েছে। এজন্য যাত্রীপ্রতি ২ টাকা, বহনযোগ্য সাধারণ মালামাল ৫ টাকা, এক বর্গমিটারের কম হাঁস-মুরগি ও মালামাল ৫ টাকা এবং এক বর্গমিটারের বেশি একই মালামালের জন্য ৮ টাকা করে টোল আদায়ের নিয়ম ধার্য করেছে বিআইডব্লিউটিএ। এছাড়াও আরো সাতটি ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ১৫ টাকা পর্যন্ত টোল আদায়ের কথা রয়েছে।
সরেজমিন সদরঘাট সংলগ্ন অন্তত সাতটি ঘাট পরিদর্শন করে দেখা যায়, প্রতিটি ঘাটেই নির্ধারিত অংকের চেয়ে বেশি পরিমাণে টোল আদায় করা হচ্ছে। ঘাটগুলো হলো তেলঘাট, ওয়াইজঘাট, রহমান সাবের ডক, আলম টাওয়ার ঘাট, ডকঘাট, ব্রিজঘাট ও আগানগর পয়েন্ট। এক্ষেত্রে যারা নিয়মিত যাত্রী তারা ৩ টাকা দিয়ে পার পেলেও অনিয়মিত যাত্রীদের কাছ থেকে জোর করে ৫ টাকা পর্যন্তও আদায় করতে দেখা গেছে। সঙ্গে বহনযোগ্য মালামাল থাকলে নির্ধারিত ফি ৫ টাকার জায়গায় ১০-২০ টাকা পর্যন্তও দিতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা।
তেলঘাট থেকে খেয়া পারাপারের জন্য যাত্রীপ্রতি টোলের পরিমাণ জানতে চাইলে ইজারাদারের প্রতিনিধি জানান এর পরিমাণ ৫ টাকা করে। রহমান সাবের ডক ঘাটেও দেখা গেছে একই চিত্র। যাত্রীদের থেকে ৫ টাকা ও ৩ টাকা করে টোল আদায় করা হচ্ছে। ঘাটের দায়িত্বরত লোকমান বলেন, আমরা জনপ্রতি ২ টাকা করেই টোল আদায় করি। যদিও ওই সময় যাত্রীদের কাছ থেকে ৩ টাকা ও ৫ টাকা করে টোল নিতে দেখা গিয়েছে। আলম হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসার কাজে প্রতিদিন অসংখ্যবার খেয়া পারাপার হতে হয়। কখনো ৩ টাকা দিই, কখনোবা জোর করে ৫ টাকা নেয়। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকির ভিত্তিতে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে আমাদের হয়রানি কমত।
অতিরক্তি যাত্রী টোল আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তেলঘাটের ইজারাদার শুভাড্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ঘাটের দায়িত্ব আমার হলেও
আমি তো টাকা তুলি না। এর আগেও আমার কাছে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে, তখন আমি টোল আদায়কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন আবার বিষয়টি কঠোরভাবে দেখব।
আগানগর পয়েন্টের ইজারাদার ফারুক আহমেদের প্রতিনিধি ফারদিন আহমেদ বলেন, ঘাটে বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগ সত্য। এ ধরনের কাজ অন্যায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।
এদিকে জীর্ণ অবকাঠামোর কারণে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে খেয়া ও ট্রলার যাত্রীদের। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীদের চরম অসুবিধার মধ্যে নদী পার হতে হচ্ছে।
গতকাল দুপুরের পর আলম টাওয়ার ঘাটে একটি ট্রলার ভেড়ে। ট্রলার ভেড়ার জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো না থাকায় ফোরশোর ভূমির ময়লা-আবর্জনার পাশে ট্রলারটি থামে। ট্রলার থেকে সিঁড়ি দিয়ে একজন নারী অনেক কষ্টে নামার পর অসুস্থ বৃদ্ধকেও ধরাধরি করে নামাতে দেখা যায়। যাত্রীরা বলেন, এসব ঘাটে নিয়মিত লক্ষাধিক যাত্রী যাতায়াত করলেও যাত্রীদের জন্য ন্যূনতম সুবিধাসম্পন্ন ঘাট ও আরসিসি সিঁড়ির ব্যবস্থা করেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে নৌযানে ওঠানামা করতে গিয়ে অনেক যাত্রী দুর্ঘটনারও শিকার হচ্ছে।
তদারকির দুর্বলতার কথা স্বীকার করে ঢাকা নদীবন্দরের কর্মকর্তা মো. গুলজার আলী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী যাতায়াত করেন। আমাদের সীমিত জনবলের মাধ্যমে এত বিপুল পরিমাণ যাত্রীদের বিষয় দেখভাল বেশ কষ্টসাধ্যই। কিন্তু যাত্রীদের সেবা দেয়ার জন্য আমাদের টোল ফ্রি মোবাইল সার্ভিস রয়েছে। সেখানে আমরা বিভিন্ন অভিযোগ পেয়ে থাকি এবং ত্বরিত সেবার ব্যবস্থাও করি।
তবে গুদারাঘাটে টোল বেশি নেয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যাত্রী টোল বেশি নেয়ার বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব। কয়েকটি পয়েন্টে জীর্ণ অবকাঠামো রয়েছে এবং এগুলো সংস্কার ও নতুন আরসিসি সিঁড়ি নির্মাণের মাধ্যমে নির্বিঘ্ন যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা হবে।










