রমজান ও ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে প্রায় ৪০ দিন পর আজ খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ফলে সকাল থেকেই বাড়বে স্কুল-কলেজ কেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোয় লেগে থাকা গাড়ির দীর্ঘ লাইনের কারণে আজ থেকে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে যানজট পরিস্থিতি। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যানবাহনও জ্বালানি খাতের ওপর তৈরি করতে পারে বাড়তি চাপ। এমন প্রেক্ষাপটে যানজট ও জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অনলাইনে ক্লাস চালুর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এবার গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে স্কুল-কলেজে রমজান ও ঈদের ছুটি শুরু হয় এবং ২৬ মার্চ পর্যন্ত তা নির্ধারিত ছিল। ২৭ ও ২৮ মার্চ সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শ্রেণী কার্যক্রম শুরু হবে আজ থেকে। অন্যদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ৯ মার্চ থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ সিদ্ধান্তের ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্ধারিত সময়ের আগেই ঈদের ছুটি শুরু হয়ে যায়। তবে সেই ছুটি কাটিয়ে আজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুনরায় একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

দীর্ঘ ছুটির এ সময়ে সড়কে যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে গত কয়েক দিন ধরেই বাইক ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে চালকদের।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ফলে সড়কে নতুন করে যুক্ত হবে কয়েক হাজার গাড়ি। বিশেষ করে মহাখালীর বিএএফ শাহীন কলেজ, সিভিল এভিয়েশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিআইপি রোডের লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ ধানমন্ডি, গুলশান ও উত্তরার বিভিন্ন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলকে ঘিরে সকালবেলা তীব্র যানজটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করে। ফলে একদিনেই সড়কে গাড়ির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। এতে শুধু যানজটই বাড়বে না, বরং জ্বালানির ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতিতে পাম্পগুলো এ বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ যদিও বলছে, দীর্ঘ ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কারণে যানবাহনের চাপ সামাল দিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক, প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ) আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন এবং আমাদের সব ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি রয়েছে। গত দুই দিন প্রচুর মানুষ রাজধানীতে ফিরেছে। এ ব্যাপারেও আমরা সজাগ ছিলাম এবং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম, যার ফলে ঢাকার কোনো প্রবেশমুখেই কাউকে যানজটে পড়তে হয়নি।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন, ‘রোববার অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে খুলছে, এ নিয়ে আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা আছে। সাধারণত সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগামী যানবাহনের চাপ থাকে। এ সময়টাকে প্রাধান্য দিয়েই আমরা আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সাজাচ্ছি, যাতে কোনো যানবাহন রাস্তায় আটকে না থাকে। তবে এ নির্দিষ্ট সময়ে রাস্তায় কিছুটা চাপ থাকতে পারে। পেট্রল পাম্পগুলোয় যানবাহনের দীর্ঘ সারিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আমরা লাইন করে দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। যদিও এটি মূলত অন্য বিভাগের কাজ, তবুও আমরা সমন্বয় করছি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে যানজট যাতে ম্যাসিভ (বিশাল) আকার ধারণ না করে, সে ব্যাপারে ট্রাফিক বিভাগ সজাগ থাকবে। তবে এ সংকটময় পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত জরুরি।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। ফিলিপাইনে তেল সংকট মোকাবেলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে; কোথাও কোথাও মানুষ হেঁটে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। পাকিস্তানে অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৩২২ রুপিতে পৌঁছেছে। ভারতে বিভিন্ন প্রদেশে তেল নিতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে দামও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশেও দ্রুত পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু না করলে সংকট আরো গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সঙ্গে সঙ্গে নগর জীবনের স্বাভাবিক গতি ফেরার কথা থাকলেও বিদ্যমান জ্বালানি সংকট সেই প্রত্যাশাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি যানজট এড়ানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অনলাইনে ক্লাস চালুর পরামর্শও তারা দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও বাড়বে। যুদ্ধ সমাপ্তির বিষয়টি যেহেতু আমাদের অজানা, তাই সব খাতেই কীভাবে জ্বালানি সাশ্রয় করা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক দেশই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস চালু করে। তবে কভিডের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি আমাদের দেশে এটি খুব একটা কার্যকর নয় এবং ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। সেক্ষেত্রে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে কী করা যেতে পারে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের উচিত অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এখনই একটি পরিকল্পনা তৈরি করা। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময় কিছুটা পরিবর্তন করা, অনলাইন-অফলাইন সমন্বিত পদ্ধতিতে পাঠদানের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।’