সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের এ উপজেলা চলতি বছর টানা তিন দফা বন্যায় তলিয়ে যায়। পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই এ উপজেলার সড়কগুলোর ওপর দিয়ে ঢল বয়। তলিয়ে যায় রাস্তাঘাটসহ নিম্নাঞ্চল। ফলে বন্যায় সিলেটের এ উপজেলার সড়কগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ উপজেলার অন্যতম প্রধান সড়ক গোয়াইনঘাট-রাধানগর-জাফলং সড়ক। বন্যায় এ সড়কের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পুরো সড়কের পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বেশক’টি সেতুর সংযোগ সড়কের মাটি সরে গিয়ে পুরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে এ সড়ক দিয়ে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই অবস্থা সিলেট-সালটিকর-গোয়াইনঘাট সড়ক, সিলেট-সারী-গোয়াইনঘাট সড়ক, গোয়াইনঘাট-সোনারহাট সড়ক, গোয়াইনঘাট-হাতিরপাড়া-ফতেহপুর সড়ক, গোয়াইনঘাট-সাতাইন-কোওর বাজার সড়কসহ উপজেলার বেশির ভাগ সড়কের।
গোয়াইনঘাটের প্রবীণ সাংবাদিক এমএ মালিক বলেন, টানা তিন দফা বন্যায় গোয়াইনঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি ও মৎস্য খাতের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় সব সড়কই বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে। অনেক সড়কে সরাসরি যোগাযোগ এখনো বন্ধ। আর ভাঙা সড়কে ভাড়া অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন চালকরা। ফলে যাত্রীরা পড়েছেন বিপাকে।
এবারের বন্যায় সিলেটে শহরাঞ্চল তেমন আক্রান্ত হয়নি। সীমান্তবর্তী উপজেলা ও গ্রামগুলোই অধিক প্লাবিত হয়েছে। ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (্এলজিইডি) আওতাধীন গ্রামীণ সড়ক। জেলায় এলজিইডির আওতাধীন প্রায় ৫২১ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে গোয়াইনঘাট উপজেলায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬২ কিলোমিটার সড়ক।
এলজিইডির সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিলেটে এলজিইডির আওতায় ৭ হাজার ৫১০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে এবারের তিন দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫২১ কিলোমিটার সড়ক। টাকার অংকে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথম দুই দফা বন্যায় কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও গোলাপগঞ্জের গ্রামীণ সড়কগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে তৃতীয় দফা বন্যায় সিলেটের নয় উপজেলার রাস্তাঘাটই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এলজিইডি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘প্রথম দফায় বন্যা হওয়ার পর আমরা একটি তালিকা তৈরি করে প্রধান প্রকৌশলী বরাবর পাঠিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় বন্যা হয়েছে। এরপর আমরা আবার একটি তালিকা তৈরি করেছি। আমাদের তালিকা অনুযায়ী সিলেট জেলায় ৫২১ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২৬০ কোটি টাকা। তবে টাকার পরিমাণ কিছুটা কমবেশি হতে পারে। কারণ অনেক সড়ক এখনো পানির নিচে রয়েছে। পানি সরলে সঠিক হিসাব বোঝা যাবে।
তিনি আরো জানান, সরকার থেকে এখন পর্যন্ত ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। শিগগিরই ঢাকা থেকে একটি টিম আসবে। তারা এসে যাচাই-বাছাই করে তার পর টেন্ডারের মাধ্যমে সংস্কারকাজ করা হবে।
সিলেটে বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলা। তবে এরই মধ্যে এসব উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। পানি নামলেও দুর্ভোগ কমেনি এলাকাবাসীর। বন্যায় সড়কগুলো ভেঙে যাওয়ায় তাদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। সড়কের পাশাপাশি বেশক’টি সেতু এবং সেতুর সংযোগ সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকা সড়কের সঙ্গে এলজিইডির আধা পাকা ও ইটসলিং সড়কগুলোও ভেঙে গেছে পানির তোড়ে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রকৌশলী রাশেন্দ্র দেব নাথ বলেন, ঢল ও বন্যায় এ উপজেলায় সড়কে প্রায় ৫৭ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বন্যায় এলজিইডির আওতাধীন সড়কগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হলেও সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন সড়কগুলোর তেমন ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ূয়া। তিনি বলেন, বন্যায় সড়ক-মহাসড়কের যে সামান্য ক্ষতি হয়েছে, তা এরই মধ্যেই সংস্কার করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারের ব্যাপারে এলজিইডি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল লতিফ জানিয়েছেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে চলতি বছরেই কাজ শেষ করা। কারণ করোনার কারণে গত অর্থবছরে অনেক সড়কই সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। এ বছর তা শেষ করতে হবে।










