২০১৫ সালের ৫ মার্চ। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উত্তর কোরিয়ার এক কূটনীতিককে আটক করেন শুল্ক কর্মকর্তারা। সন ইয়ং-ন্যাম নামের ওই কূটনীতিক ছিলেন ঢাকায় উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সিঙ্গাপুর থেকে আসছিলেন তিনি। ঢাকায় নেমে বের হয়ে যাচ্ছিলেন গ্রিন চ্যানেল দিয়ে। ওই সময় প্রায় ২৭ কেজি ওজনের আনুমানিক ১৪ লাখ ডলার মূল্যের স্বর্ণ পাচারের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। 

শুধু ঢাকায় স্বর্ণ পাচার নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নানা সময়ে এমন অনেক বিধিবহির্ভূত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে উত্তর কোরীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈরী দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জাল এড়ানোর জন্যই মূলত অবৈধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। এর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ জমা পড়ছে কিম জং-উনের ওয়ার্কার্স পার্টির তহবিলে। আর বিধিবহির্ভূত ও অবৈধ কার্যক্রমের তদারকি করছে রুম ৩৯ (থার্টি নাইন) বা ব্যুরো ৩৯।  

রুম ৩৯ মূলত গোপন একটি কার্যালয়। এটি ডিভিশন ৩৯ বা অফিস ৩৯ হিসেবেও পরিচিত। এর অন্যতম কাজ হলো গোটা দুনিয়ায় ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় দূতাবাসগুলোর পাওয়া নানামুখী ছাড় ও সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা। এ কার্যালয়ের মাধ্যমে স্বর্ণ, মাদক চোরাচালান থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বীমা জালিয়াতির মতো বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টি। 

সম্প্রতি ঢাকা থেকে উত্তর কোরিয়ার দূতাবাস গুটিয়ে নেয়ার ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিশ্বব্যাপী কোরিয়ার মিশনগুলোর উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিস্থাপনের অংশ হিসেবে দেশটির সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন ভালো নয়। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ঢাকা থেকে মিশন গুটিয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে।

যদিও বাংলাদেশ থেকে দূতাবাস গুটিয়ে নেয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির গোপন ও বিধিবহির্ভূত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, সে প্রশ্ন তুলছেন ঢাকার কূটনৈতিক অঙ্গনের কেউ কেউ। বাংলাদেশে ডলার সংকটের কারণে রুম ৩৯-এর মতো সংস্থাগুলোর এখানে গোপন ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করছেন তারা। 

তারা বলছেন, দেশে ডলারের খোলাবাজারের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। আবার উত্তর কোরিয়ার কূটনীতিকদের স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার নজিরও রয়েছে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে চোরাচালানসহ বিভিন্ন অবৈধ ও গোপন ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ার কারণেও দূতাবাস বন্ধ হয়ে থাকতে পারে।  

রুম ৩৯ উত্তর কোরিয়া ও এর বাইরে বিভিন্ন পন্থায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। পিয়ংইয়ংয়ে রেস্তোরাঁ চেইন ব্যবসা, স্বর্ণ ও দস্তা উত্তোলন এবং কৃষিপণ্য ও মৎস্য সম্পদ থেকে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার কাজটি তদারকি করছে রুম ৩৯। বলা হয়, সংস্থাটি বেশ কিছু বৈধ-অবৈধ কোম্পানির নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। ব্যুরো ৩৯ নিয়ন্ত্রিত কোম্পানির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য অনুযায়ী, রুম ৩৯-এর কোম্পানির সংখ্যা ৩৯ থেকে ১২০টি। এসব কোম্পানিকে আবার প্রায়ই নাম বদলাতে দেখা যায়।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের তৎকালীন ফার্স্ট সেক্রেটারি হান সন-ইকের নামে আসা সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের সিগারেট ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আটক করেন শুল্ক কর্মকর্তারা। যথাযথ প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে ওই পণ্য আনার অভিযোগে ওই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরপর হান সন-ইককে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।

উত্তর কোরিয়া থেকে প্রতি বছর অন্তত ৫০ কোটি ডলারের টেক্সটাইল পণ্য রফতানি হয়। এসব পণ্যে আবার জাল ‘‌মেড ইন চায়না’ লেবেল লাগানো থাকে। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার ৫০ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যবস্থাপনার কাজটিও রুম ৩৯ করে থাকে। প্রতি বছর প্রবাসীদের পাঠানো ৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ রুম ৩৯-এর আয়ে যুক্ত হচ্ছে।  

এছাড়া জাল ডলার পাচার, ভুয়া উত্তেজক ট্যাবলেট, এন-মেথিল্যামফিটামিন জাতীয় মাদক ও সিঙ্গাপুরের দালালদের মাধ্যমে সংগৃহীত রুশ জ্বালানি তেলের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে সংস্থাটি। এক পর্যায়ে উত্তর কোরিয়ার মোট লেনদেন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল অফিস ৩৯।

ওয়াশিংটন পোস্টের ২০০৯ সালের এক প্রতিবেদনে উত্তর কোরিয়া সরকারের এক বৈশ্বিক বীমা জালিয়াতির খবর প্রকাশ হয়। নকল দলিল তৈরির সঙ্গেও নাম এসেছে রুম ৩৯-এর। ২০১৫ সালে কোরিয়া ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন (কেএনআইসি) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সে সময় রুম ৩৯-এর সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৭৯ কোটি ডলারের সম্পদ ছিল কেএনআইসির। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বীমা বাজারে জালিয়াতি এবং এর মাধ্যমে পাওয়া অর্থ প্রপার্টি ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বিনিয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। ২০১৬ সালে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ ত্যাগ করা থায়ে ইয়ং হো নামে এক কূটনীতিক জানিয়েছিলেন উত্তর কোরিয়া প্রতি বছর বীমা জালিয়াতির মাধ্যমে অন্তত ১ কোটি ডলার আয় করে থাকে। 

রয়টার্সের সাম্প্রতিক খবর অনুসারে, স্পেন, হংকং ও আফ্রিকার একাধিক দেশসহ এক ডজনের মতো দূতাবাস বন্ধ করতে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে ব্যয় সংকোচনের জন্য এমন সিদ্ধান্ত। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিশ্বব্যাপী পিয়ংইয়ংয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ দূতাবাস বন্ধ হয়ে যাবে। 

জানতে চাইলে গতকাল ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়। এছাড়া নানা ধরনের অনিশ্চয়তায় বৈশ্বিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকা থেকে মিশন গুটিয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে।

এর আগে ৩ ডিসেম্বর সাপ্তাহিক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিকল্প মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম ঢাকায় উত্তর কোরিয়ার দূতাবাস বন্ধ ঘোষণা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি সম্প্রতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকার উত্তর কোরিয়ার দূতাবাস বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টি জানিয়েছে।’ 

বিশ্বব্যাপী কোরিয়ার মিশনগুলোর উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিস্থাপনের অংশ হিসেবে কোরিয়ার সরকার এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে কূটনৈতিক পত্রে জানানো হয় উল্লেখ করে মোহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, ‘‌উত্তর কোরিয়া ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম দূতাবাস চালু করে। গত মাসের তৃতীয় সপ্তাহে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত তার তিন সহযোগী কর্মকর্তাসহ ঢাকা ত্যাগ করার মাধ্যমে বাংলাদেশে উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটে। স্পেনের সঙ্গে যোগাযোগে উত্তর কোরিয়া যেভাবে ইতালির মিশনের সাহায্য নিচ্ছে, বাংলাদেশেও একই প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে দেশটি। এখন থেকে ভারতের নয়াদিল্লির উত্তর কোরীয় দূতাবাসের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো পরিচালিত হবে। অন্যদিকে চীনের বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।’

এ বিষয়ে মন্তব্য করেছে উত্তর কোরিয়ার বৈরী প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার ইউনিফিকেশন মিনিস্ট্রি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে হোঁচট খেয়েছে উত্তর কোরিয়া। এর ফলে দূতাবাস আর এর রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যে সময়ে ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে ন্যূনতম কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, ঠিক সে সময় উত্তর কোরিয়ার এ ধরনের পদক্ষেপ দেশটির কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।’