চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য ছিল না কোনো বিদ্যালয়। দীর্ঘ পথ ও যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ত শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের দূরত্ব বেশি হওয়ায় মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতেন অভিভাবকরা। অনেকে আবার ছেলেমেয়েদের আত্মীয়স্বজনের বাসায় রেখে পড়াশোনা করাতেন। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের ঝরে পড়া রোধে এবার সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের নামে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বিদ্যালয়টি। ৯ নভেম্বর বিদ্যালয় ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর।
আগামী বছরের জানুয়ারিতেই বিদ্যালয়ে শুরু হবে পাঠদান। এ লক্ষ্যে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জেহের আলী।
এ বিষয়ে নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাইমেনা শারমীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত গ্রামেই কৃষকের পক্ষে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন গড়ে তুলেছেন ইলা মিত্র। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামেই করা হয়েছে বিদ্যালয়ের নামকরণ। পাশাপাশি ইলা মিত্রের বিভিন্ন ইতিহাস সংরক্ষণে একটি সংগ্রহশালাও নির্মাণ করা হচ্ছে।’
তবে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, পাশাপাশি ওই ছয়টি গ্রামে সড়ক নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন নাচোল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী ইসলাম জেসী বলেন, ‘কয়েক মাস আগে একটি অনুষ্ঠানে এসে জানতে পেরেছি ওই ছয়টি গ্রামে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। পরে বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখিয়েছেন।’
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত গ্রাম কার্ত্তিকপুর, ধরলশ্যামপুর, ধরইল, জমিন-কমিন, নতুনপাড়া ও বাসুগ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এসব গ্রাম থেকে সবচেয়ে কাছের বিদ্যালয়টির দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেখানে নির্মাণ হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখন আর কেউ বঞ্চিত হবে না শিক্ষার আলো থেকে।
বাসুগ্রামের কলেজছাত্রী সোনিয়া টুডু বলেন, ‘আমি রাজশাহীতে পড়ালেখা করি। প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করতে পারিনি। যেতে হয়েছে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি। সেখানে থেকে স্কুলে পড়েছি। আমার মতো অনেকেই নিজ বাড়ি ছেড়ে দূরে গিয়ে স্বজনের বাসায় পড়ালেখা করেছে। সবার জন্য এমন সুযোগ না থাকায় এখানকার বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করতে পারত না।’
গৃহবধূ কিসকু মুরমু বলেন, ‘আমার মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি মাত্র ১৪ বছর বয়সে। স্কুলে যেতে হতো প্রায় সাত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। এত দূরের স্কুলে পাঠানো ঝুঁকি মনে করেই বিয়ে দিয়েছি। আমার মতো অনেক অভিভাবকই তাদের মেয়েকে প্রাথমিক বা মাধ্যমিকে পড়ার সময়ই বিয়ে দিয়েছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা সঞ্জয় বলেন, ‘স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় পড়ালেখা বাদ দিয়ে মেয়েদের বিয়ে ও ছেলেদের বিভিন্ন কাজে লাগাতেন অভিভাবক। এছাড়া এখানকার সড়কে বর্ষার সময় কাদা ও অন্যান্য সময় ধুলাবালিতে পরিপূর্ণ থাকে। ফলে সাত কিলোমিটার দূরের স্কুলে যাওয়া কষ্টকর ছিল শিক্ষার্থীদের কাছে।’
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নেতা বিধান সিং জানান, সরকারের এ উদ্যোগের ফলে অন্ধকারে থাকা এসব গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছবে। এর আগে এসব গ্রামের শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত ছিল। সরকারের এমন উদ্যোগের ফলে সবাই প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আসতে পারবে।










