জলচর সরীসৃপ ঘড়িয়াল। দেখতে অনেকটা কুমিরের মতো হলেও আচরণে হিংস্রতার লেশ নেই। মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে বলে এর ভদ্র নাম মেছো কুমির। পুরুষ ঘড়িয়ালের ওপরের চোয়ালে, নাকের ঠিক ওপরে কলস বা ঘড়া আকৃতির একটি পিণ্ড থাকে। সে কারণেই প্রাণীটির নাম ঘড়িয়াল বলে অনেকের যুক্তি। এছাড়া ঘাড়েল, বাইশাল, ঘট কুমির, লম্বা নাক কুমির, নাকা, নাকার নামেও পরিচিত। একসময় বাংলাদেশসহ এশিয়ার নদ-নদীতে প্রচুর দেখা মিলত এটির। গবেষকদের মতে, নাব্য হ্রাস ও দূষণের প্রভাবে প্রাণীটি এখন অতিবিপন্নের তালিকায়। ঠাঁই হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর সংকলন লাল বইয়ে।

ঠিক কী কারণে আইইউসিএনের লাল বইয়ে ঘড়িয়ালের নাম উঠেছে তা নিয়ে বিস্তর কথা হয় প্রাণিবিদদের সঙ্গে। তাদের বক্তব্য, একটি প্রজাতি অনেক কারণেই বিপন্ন হয়ে পড়ে। ঘড়িয়ালের ক্ষেত্রে শক্ত কারণ জলাধারের নাব্য হ্রাস। নদ-নদীর অবস্থা এখন শোচনীয়। পলি জমে জমে ভরাট হয়ে গেছে। তার ওপর আছে মানুষের অত্যাচার। ফলে বাসস্থান হারাচ্ছে প্রাণীটি। আছে খাদ্য সংকট। ঘড়িয়াল যেহেতু মাছ খেয়ে বাঁচে তাই দেশের নদ-নদীতে মাছের অপ্রতুলতা তার বিপন্ন হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। 

ঘড়িয়াল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন মাগুরার সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম নজরুল কবীর। জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌একসময় বাংলাদেশসহ আমাদের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ যেমন ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও মিয়ানমারে প্রাণীটি ব্যাপক দেখা যেত। স্বাভাবিকভাবে ৫০-৬০ বছর বাঁচলেও মানুষের আগ্রাসনের কারণে এরা এখন বিলুপ্তির পথে।’

প্রাণীটির দৈহিক কাঠামো ও জীবনাচার সম্পর্কে অধ্যাপক ড. নজরুল কবীর জানান, লেজের মাথা থেকে বর্ধিত চোয়ালের অগ্রভাগ পর্যন্ত একটি ঘড়িয়াল সর্বাধিক ছয় মিটার (২০ ফুট) লম্বা এবং ওজনে ১৬০ কেজি পর্যন্ত হয়। সাধারণত বয়স্ক পুরুষ ঘড়িয়াল পাঁচ-ছয় মিটার এবং মাদি সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বয়স্করা কালচে ধূসর হলেও বাচ্চা ঘড়িয়ালের রঙ উজ্জ্বল। মার্চ ও এপ্রিল ঘড়িয়ালের প্রজনন ঋতু। এ সময়ে মা প্রাণীটি নদীর বালিয়াড়িতে ডিম পেড়ে বালি দিয়ে ঢেকে রাখে। একসঙ্গে এরা ২০ থেকে ৯৫টি ডিম পাড়ে। ৭১-৯৩ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। সদ্যোজাত ঘড়িয়াল মূলত ২২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। তবে অনেক সময় এরা বড় বড় পাখি, কুমির ও বোয়ালজাতীয় রাক্ষুসে মাছের শিকারে পরিণত হয়। ঘড়িয়ালেরও খাদ্য হিসেবে বোয়াল, আইড়, গুঁজি, পাঙাশ বেশি পছন্দ। আর বাচ্চা ঘড়িয়াল বিভিন্ন ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণী যেমন কীটপতঙ্গ ও ছোট আকারের ব্যাঙ খায়।

একসময় পদ্মা ও যমুনা নদীতে প্রচুর ঘড়িয়ালের আনাগোনা ছিল। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ ও জলজ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে প্রাণীটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। এক গবেষণা শেষে এটির বিলুপ্তির দাবিও করা হয়েছিল। এ বিষয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (রাজশাহী) আহম্মদ নিয়ামুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সপ্তাহ খানেক আগেও পাবনায় জেলেদের জালে একটি ঘড়িয়াল ধরা পড়ে। সেটা আমরা জেলেদের থেকে উদ্ধার করে পদ্মায় ছেড়ে দিই। গত বছরও একটি ঘড়িয়াল ধরা পড়ে। এর আগে আমি যখন বগুড়ায় ছিলাম সেখানেও ঘড়িয়াল ধরা পড়েছে। তাই বলব, ঘড়িয়াল বিলুপ্তির যে দাবি করা হয়েছিল সেটা সঠিক নয়। তবে আমাদের দেশে এর সংখ্যা কত সে নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি।’ 

বর্তমানে রাজশাহী শহরসংলগ্ন পদ্মা নদীতে মাঝে মধ্যে ঘড়িয়ালের দেখা মেলে। কুমির ভেবে নিরীহ প্রাণীটিকে নির্বিচারে হত্যা, সরকারের উদাসীনতা ও শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় ঘড়িয়াল বিলুপ্তির প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছেন গবেষকরা। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীটি বিশেষ ভূমিকা রাখলেও এটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপাল ঘড়িয়াল রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে কৃত্রিম প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। 

খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৎস্য বিশেষজ্ঞ মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ঘড়িয়াল যে একটি শান্ত প্রাণী, আক্রমণ করে না বললেই চলে, এটা অনেক জেলেই জানেন না। ফলে তারা এটিকে কুমিরের মতো হিংস্র ভেবে পিটিয়ে মেরে ফেলেন। এ কারণে ঘড়িয়াল আরো বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ঘড়িয়ালসহ অন্যান্য বিপন্ন প্রাণী রক্ষায় মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।’  

পদ্মা নদীতে ১৯৯০ সালের দিকে জেলেদের জালে ধরা পড়া একটি মাদি ঘড়িয়াল রাজশাহী কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানায় রাখা হয়। পরে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে একটি পুরুষ ঘড়িয়াল সেখানে নেয়া হয়। এ তথ্য জানিয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) স্বাস্থ্য বিভাগের ভেটেরিনারি সার্জন ও চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধায়ক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘গত বছর মাদি ঘড়িয়াল ১২টির মতো ডিম পেড়েছিল। এরা স্বাভাবিকভাবে বালিতে ডিম পেড়ে অভ্যস্ত। তবে রাজশাহীর এ ঘড়িয়াল ডিম পেড়ে তা সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে অভিজ্ঞ না। তাই ডিম পাড়ার পর অর্ধেকের মতো নিজেই ভেঙে ফেলে। তবে বাকি ডিমগুলো আমরা সংরক্ষণ করে বালিতে রেখেছিলাম, কিন্তু তাতে প্রজনন সক্ষমতা ছিল না। তাই বাচ্চা আসেনি।’

চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরহাদ বলেন, ‘ঘড়িয়ালের প্রজননের ব্যাপারে পরিবেশবাদী সংস্থা আইইউসিএন আমাদের সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। আমরাও এ বিষয়ে তৎপর রয়েছি এবং ঘড়িয়ালের বসতভিটা রক্ষণাবেক্ষণ ও মনিটরিংসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। আসছে নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে ডিম দেবে ঘড়িয়াল। এবার আমরা আশায় আছি বিলুপ্ত এ প্রজাতির প্রজনন করে অন্তত রাজশাহীতে তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারব।’ 

ঘড়িয়াল কনজারভেশন ইন বাংলাদেশের উদ্যোগে ২০১০ সালে রাজশাহীতে একটি প্রকল্পও চালু হয়েছিল। তবে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে প্রকল্পটি আর নবায়ন করা হয়নি বলে জানান বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন্যপ্রাণী পরিদর্শক (রাজশাহী) জাহাঙ্গীর কবির। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রাজশাহী চিড়িয়াখানার উদ্যোগে ঘড়িয়াল প্রজননের চেষ্টা চলছে। তবে সেটার সফলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি আছে। কেননা যে পরিবেশে ঘড়িয়ালের প্রজনন হওয়ার কথা সে পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।’ 

নিজেদের স্বার্থেই বিপন্ন এসব প্রাণী বাঁচিয়ে রাখা জরুরি বলে মনে করেন পরিবেশবীদরা। তাছাড়া দেশের নদ-নদীগুলো এখনো ঘড়িয়াল টিকে থাকার জন্য উপযোগী বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অল্প পানি হলেও ঘড়িয়াল বেঁচে থাকতে পারে। ওরা মূলত চর এলাকায় ডিম পাড়ে। কিন্তু ক্রমাগত অবকাঠামো উন্নয়ন, মানববসতি বৃদ্ধি, জেলেদের আগ্রাসনে ঘড়িয়ালের আবাসটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তারা এখন আর ডিম পাড়ার জায়গা পায় না। ডিম পাড়লেও সেটা মানুষ নষ্ট করে ফেলে। নানাবিধ কারণে ঘড়িয়াল বিপন্ন হয়ে পড়েছে।’ 

এ মুহূর্তে সরকারি উদ্যোগেই ‘ঘড়িয়াল অভয়ারণ্য’ ঘোষণা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঘড়িয়াল টিকিয়ে রাখতে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ভারত ও নেপালের মতো এ দেশেও কৃত্রিম প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশের মানুষ চরম অসচেতন। ঘড়িয়াল, সাপ, গুইসাপ দেখলেই পিটিয়ে মেরে ফেলে। এ অসচেতনতা দূর করা না গেলে সামনে আমাদের জন্য অনেক বড় বিপদ আছে।’

রাজশাহী চিড়িয়াখানার ঘড়িয়াল সম্পর্কে জানতে রাজশাহী প্রতিনিধি বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি জানান, ১৯৯০ সালের দিকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানায় পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়া একটি ঘড়িয়াল চিড়িয়াখানায় রাখা হয়। বছর খানেক পর আরো একটি ঘড়িয়াল ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে রাজশাহীতে আনা হয়। রাজশাহী চিড়িয়াখানায় থাকা দুটি ঘড়িয়ালই নারী। এ কারণে বছর চারেক ঢাকা কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানায় থাকা চারটি নর ঘড়িয়ালের ভেতর থেকে একটি রাজশাহীতে নিয়ে আসা হয় এবং রাজশাহীর একটি ঘড়িয়ালকে ঢাকায় দেয়া হয়। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) স্বাস্থ্য বিভাগের ভেটেরিনারি সার্জন ও চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধায়ক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. মো. ফরহাদ হোসেন।

বণিক বার্তাকে তিনি জানান, ‘সম্প্রতি রাজশাহী চিড়িয়াখানার ঘড়িয়ালের বসতভিটার মেরামত করা হয়। গত বছর নারী ঘড়িয়াল ১২টির মতো ডিম পেড়েছিল। এর মধ্যে অর্ধেক ডিমই ঘড়িয়াল নষ্ট করে ফেলে। পরে তাদের বসবাসের একাংশ জায়গায় মাটি ও বালি ফেলা হয়। ঘড়িয়ালের প্রজননের ব্যাপারে এবার আইসিইউএন নামে একটি পরিবেশবাদী সংস্থা আমাদের সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। আমরাও এ বিষয়ে তৎপর রয়েছি এবং ঘড়িয়ালের বসতভিটায় মনিটরিং ব্যবস্থারও পদক্ষেপ নিয়েছি। নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে ডিম দেবে ঘড়িয়াল। এবার আমরা আশায় আছি এ বিলুপ্ত প্রজাতির প্রজনন করে অন্তত রাজশাহীতে তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারব।’