এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর তাগিদ থেকে। এ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংকগুলো। সংগৃহীত এসব আমানত বিনিয়োগ হচ্ছে শহরাঞ্চলে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা থেকে যাচ্ছেন উপেক্ষিত। যথাযথ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বদলে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের সঞ্চয়ের অর্থ শহরে আসছে। এ আমানত থেকেই শহুরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এ ঋণের বড় অংশ যুক্ত হচ্ছে খেলাপির খাতায়। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়ের টাকা ব্যয় হচ্ছে লুটেরা গোষ্ঠীর বিলাসিতা ও অর্থ পাচারের কাজে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংবিষয়ক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছর শেষে এজেন্টদের মাধ্যমে ৭ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে ২১টি ব্যাংক। অন্যদিকে এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করেছে মাত্র নয়টি ব্যাংক। যদিও আমানতের তুলনায় বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ যৎসামান্য। ২০১৯ সালে এজেন্টদের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪৪৬ কোটি টাকার। সে হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ হয়েছে সংগৃহীত আমানতের মাত্র ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আবার এ বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ৯৫ শতাংশেরই উৎস মাত্র তিনটি ব্যাংক।

বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেবার চরিত্রগত ত্রুটির কারণেই গ্রামাঞ্চলে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে যেসব ব্যাংকের শাখা রয়েছে, সেগুলোও এসব শাখার মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের ১০ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারেনি। বরং গ্রাম থেকে আনা আমানতের হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে দেয়া হয়েছে ঢাকা শহরের চিহ্নিত পুঁজি লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে। এ লুটেরারা জনগণের আমানতের অর্থ দেশ থেকে পাচার করে দিচ্ছে অথবা ভোগবিলাসে ওড়াচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ছে। খেলাপি হওয়া এসব ঋণ কখনই ব্যাংকে ফিরে আসবে না।

ড. মইনুল ইসলামের মতে, যেখানে ব্যাংকের গ্রামীণ শাখাগুলোই ঋণ বিতরণে ব্যর্থ, সেখানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভালো কিছু আমরা আশাই করতে পারি না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়ের অর্থ এজেন্টদের মাধ্যমে এভাবে শহরে চলে আসায় অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূলস্রোতে নিয়ে আসার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালার আওতায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন নিয়েছে ২৪টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মধ্যে গত বছর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেছে ২১টি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো গত বছর পর্যন্ত সারা দেশে ৭ হাজার ৮৫৬ এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে, যার ৮২ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের। এসব এজেন্টের মাধ্যমে চালু করা আউটলেটে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯৬টি। এসব হিসাবে জমা হয়েছে ৭ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার আমানত। সংগৃহীত এ আমানত থেকে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪৪৬ কোটি টাকার, যার ৩৪ শতাংশ পেয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয়েছিল ব্যাংক এশিয়ার হাত ধরে। গ্রামাঞ্চলে এজেন্টদের মাধ্যমে বিতরণকৃত ৪৪৬ কোটি টাকা ঋণের ২৮৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ৫৮ শতাংশ দিয়েছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী মো. আরফান আলী মনে করছেন ঋণ অবকাঠামো বা উদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে না ওঠায় গ্রামাঞ্চলে সেভাবে ঋণ বিতরণ করা যায়নি। যদিও আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ সহসাই বাড়বে বলে আশাবাদী তিনি।

বণিক বার্তাকে মো. আরফান আলী বলেন, সেবাটি চালুর উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেয়া। এ সেবার মানে শুধু আমানত সংগ্রহ নয়। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ দেয়াসহ সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা দেয়াই হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। তবে গ্রামাঞ্চলে ঋণ দেয়ার মতো অবকাঠামো বা উদ্যোক্তা শ্রেণী সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আবার ব্যাংকগুলোও এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ দেয়ার প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি। আশা করছি, সহসাই এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার কার্যক্রম শুরু করবে।

ঋণ বিতরণের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে আছে ব্র্যাক ব্যাংক। এজেন্টদের মাধ্যমে ৯৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ২২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে ঋণের ১৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংকই এজেন্টদের মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের ৯৫ শতাংশের জোগান দিয়েছে।

অন্যদিকে এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব চালুু করার দিক থেকে শীর্ষস্থানে আছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট হিসাবের ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশই ব্যাংকটির। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যাংক এশিয়া চালু করেছে মোট ব্যাংক হিসাবের ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ৪ দশমিক ২৬ এবং অগ্রণী ব্যাংক ২ দশমিক ৭০ শতাংশ ব্যাংক হিসাব চালু করেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৯০ দশমিক ১৯ শতাংশ হিসাব চালু করেছে এ পাঁচ ব্যাংক।

হিসাব খোলার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে থাকলেও আমানত সংগ্রহের দিক থেকে প্রথম স্থানে আছে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত মোট আমানতের ২১ দশমিক ৬৯ শতাংশ সংগ্রহ করেছে ব্যাংকটি। দ্বিতীয় স্থানে আছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। সংগৃহীত মোট আমানতে ব্যাংকটির অংশ ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ১৯ দশমিক শূন্য ৩ ও অগ্রণী ব্যাংক ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ আমানত সংগ্রহ করেছে। সব মিলিয়ে এজেন্টদের মাধ্যমে সংগৃহীত মোট আমানতে এ পাঁচ ব্যাংকের অংশ ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ ।

শুরু থেকে পুরোদমে করপোরেট ব্যাংকিং করলেও এখন সে অবস্থা থেকে সরে এসেছে দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড। রিটেইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো কার্যক্রমে জোর দিয়ে সামনে এগোচ্ছে ব্যাংকটি। দেশের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংকের অবস্থান তৃতীয়। এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যাংকটি আমানত সংগ্রহ করেছে ১৫৭ কোটি টাকা। এ আমানত থেকে ৬৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিদ্যমান মডেলকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং বলা যায় না বলে মনে করেন সিটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মাসরুর আরেফিন। তার মতে, আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ এবং পেমেন্ট ব্যবস্থার সমন্বয় হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং বলা যায়। কিন্তু এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো শুধুই আমানত সংগ্রহ করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোতে তারল্যের সংস্থান হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অর্থের আবর্তন (মোবিলাইজেশন) হচ্ছে না। ঋণ বিতরণ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি হবে না। এটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং বলা যায় না। তবে সিটি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করার পর থেকেই আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি ঋণ বিতরণ করছে।